অগ্নিকন্যা আশালতা সেন

By Dr. Abdul Alim on December, 27 2017 with no comments

সভ্যতার বাঁকে বাঁকে ধর্মাচার, শাস্ত্রাচার, দেশাচার ও সামাজিক-রাজনৈতিক নানা অনুশাসন, বিধি-বিধান এবং সংস্কার-কুসংস্কারে নারীজীবন বিপন্ন হয়েছে। ভারতীয় সমাজও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। এখানে ধর্ম, সমাজ ও শাস্ত্রের নামে নানাভাবে নারীদের অগ্রযাত্রা ব্যহত করা হয়েছে, তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, চালানো হয়েছে অমানবিক অত্যাচার-নির্যাতন। সতীদাহ, পর্দাপ্রথা, পণপ্রথা এবং কৌলিন্য-প্রথার যূপকাষ্ঠে বলি হয়েছে অগণিত নারীর জীবন। এই তমসাচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যেও কোনো কোনো নারী সকল শৃঙ্খল ভেঙে আলোর মশাল হাতে বের হয়ে এসেছেন, সমাজ-সভ্যতার অগ্রযাত্রায় শামিল হয়েছেন। এমনি এক সংগ্রামী নারী আশালতা দাশগুপ্ত সেন (১৮৯৪-১৯৮৬)। পরাধীন ভারতবর্ষের পশ্চাৎপদ ও অন্ধকার সমাজে তিনি ছিলেন সত্যিকারের বহ্নিশিখা। স্বীয় কর্মদক্ষতা, সাহসিকতা ও প্রতিভার যোগ্যতায় তিনি সমকালীন সমাজ, রাজনীতি এবং শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, নারীসমাজের অগ্রযাত্রায় আশালতা সেন আবির্ভূত হয়েছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে। ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করতে এবং সকল শৃঙ্খল ভেঙে নারীদের বের করে আনতে তিনি সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

অগ্নিকন্যা আশালতা দাশগুপ্ত ১৮৯৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। পৈত্রিক নিবাস বিক্রমপুরের বিদগাঁও। তাঁর পিতা বলগামোহন দাশগুপ্ত ছিলেন নোয়াখালী জজকোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী। পারিবারিক পরিসরে পেয়েছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামের প্রেরণা এবং নিজেকে গড়ে তোলার উপযুক্ত পরিবেশ। তাঁর মাতামহী নবশশী দেবী ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের কর্মী। বস্তুত, তাঁর প্রেরণাতেই আশালতা দাশগুপ্ত অতি অল্প বয়সে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় নবশশী দেবী, সুশীলা সেন ও কমলকামিনী গুপ্ত মিলে গড়ে তোলেন ‘মহিলা সমিতি’ এবং ‘স্বদেশী ভা-ার’। এগোরো বছর বয়সী আশালতা দাশগুপ্তকে দেওয়া হয় বিলাতি কাপড় বর্জনের সংকল্প-পত্রের স্বাক্ষর সংগ্রহের দায়িত্ব। মাতামহীর আদেশে দ্বারে দ্বারে গিয়ে গ্রামের মহিলাদের কাছ থেকে বিলাতি কাপড় বর্জনের সংকল্পপত্রে স্বাক্ষর সংগ্রহ করে তিনি স্বাদেশী আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে শামিল হন। মূলত, মাতামহী নবশশী দেবীর প্রত্যক্ষ তাগিদ ও উৎসাহে স্বাদেশী আন্দোলনে সম্পৃক্তি থেকে আশালতা দাশগুপ্তের সংগ্রামী জীবনের হাতেখড়ি হয়।

মাতামহী নবশশী দেবী আশালতা দাশগুপ্তের চেতনায় স্বাজাত্যবোধ ও সংগ্রামীচেতনার যে অগ্নিশিখা প্রজ্বালিত করে দিয়েছিলেন, তা ক্রমে বিকশিত হয়ে মধ্যাহ্ন সূর্যের তেজে পরিণত হয়। সংসারধর্মে প্রবেশ এবং ১৯১৬ সালে স্বামী সত্যরঞ্জন সেনের অকালমৃত্যুতে সে তেজ কিছুতা স্তিমিত হয়ে পড়লেও, পরে তা আবার দীপ্তিমান হয়ে ওঠে। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন আশালতা সেন স্বরূপে উদ্ভাসিত হন, যুক্ত হন এই আন্দোলনের সঙ্গে। ১৯২২ সালে ঢাকা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে গয়া কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯২৫ সালে ‘নিখিল ভারত কাটুনী সংঘে’র সদস্য হন এবং খদ্দর প্রচারে নিয়োজিত হন। ১৯৩০ সালের ‘লবণ আইন’ অমান্য আন্দোলনে সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দেন। এ আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী সরমা গুপ্তা এবং ঊষাবালা গুহকে সঙ্গে নিয়ে নোয়াখালী থেকে নোনাপানি এনে ঢাকার করোনেশন পার্কে সকলের সামনে লবণ তৈরি করে আইন অমান্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুধু তাই নয়, বাংলা এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ‘লবণ আইন’ অমান্য আন্দোলন সংঘটনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন এবং কারারুদ্ধ হন। পরে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৩২ সালে মহাত্মা গান্ধীকে গ্রেফতার করা হলে অসহযোগ আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। এ সময় ‘গে-ারিয়া মহিলা সমিতি’কে বেআইনি ঘোষণা করা হয় এবং ‘কল্যাণ কুটির’ কর্মীদের বাসগৃহ তালাবদ্ধ করে দেয় পুলিশ। এই জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আশালতা সেন আবারও গ্রেফতার হন। কয়েকটি মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হন। ১৯৩৩ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হলে তাঁকে ঢাকা জেলা কংগ্রেসের সহ-সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। ১৯৪২ সালে মহাত্মা গন্ধী ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের ডাক দিলে আশালতা সেন সে আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন। এ আন্দোলনের সময় ঢাকার তালতলায় পুলিশের গুলীতে এক যুবক নিহত হন। এর প্রতিবাদে মিছিলে নেতৃত্বদান করতে গিয়ে আশালতা সেন গ্রেফতার হন এবং সাড়ে সাত মাস সশ্রম কারাদ- ভোগ করেন। এভাবে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্বদান এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি সরকারের রোষানলে পড়ে বারবার কারারুদ্ধ হন এবং জনগণের আস্থা অর্জন করেন। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরে তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য এবং ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালের তিনি দিল্লিতে পুত্রের কাছে চলে যান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে আশালতা সেন নানাভাবে সহযোগিতা করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দিতে বেশকিছু গানও রচনা করেন।

বাংলার নারীসমাজের অগ্রগতি ও কল্যাণে আশালতা সেন নানাভাবে কাজ করেছেন। ঢাকার গে-ারিয়ায় মহিলাদের প্রশিক্ষণের জন্য ‘শিল্পাশ্রম’ নামে একটি বয়নাগার প্রতিষ্ঠা করেন। নারীদের মধ্যে স্বদেশচেতনা ও দেশপ্রেম জাগ্রত করা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে ১৯২৪ সালে সরমাগুপ্ত ও সরযুবালা গুপ্তর সহযোগিতায় গড়ে তোলেন ‘গে-ারিয়া মহিলা সমিতি’। মহিলা কর্মী সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ১৯২৭ সালে ঢাকায় গড়ে তোলেন ‘কল্যাণ কুটির আশ্রম।’ শিক্ষাবিস্তারে তাঁর উল্লেখযোগ্য আবদান ১৯২৯ সালে ‘জুড়ান শিক্ষা মন্দির’ প্রতিষ্ঠা। তিনি গভীরভাবে উপলব্দি করেছিলেন যে, সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, এই নারীদের জাগরণ ও কল্যাণ ছাড়া সমাজ ও জাতির কল্যাণ সম্ভব নয়। সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে সেজন্য তাদের সচেতন ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠা করেন বিভিন্ন নারী সংগঠন। এই সংগঠনগুলো হলো : জাগ্রত সেবিকা দল (১৯৩০), রাষ্ট্রীয় মহিলা সংঘ (১৯৩১), নারী কর্মী শিক্ষাকেন্দ্র (১৯৩১) ও কংগ্রেস মহিলা সংঘ (১৯৩৯)। বিক্রমপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মহিলা সংঘের শাখা স্থাপন করা হয়। ঢাকা ছাড়াও শ্রীহট্ট এবং মেদিনীপুরের কাঁথিতে নারীকর্মী শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন। নারীদের সংগঠিত করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছুটে গেছেন। তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়েছেন। এককথায় এদেশের নারীমুক্তি আন্দোলনে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন।

আশালতা সেনের বড় পরিচয় তিনি একজন সাহিত্যিক। সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের কল্যাণচিন্তা করেছেন। অল্প বয়সেই তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার উন্মেষ ঘটে এবং ধীরে ধীরে তা পরিণতি লাভ করে। ১৯০৪ সালে তাঁর বয়স যখন মাত্র দশ বছর তখন ‘মাসিক অন্তঃপুর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর জাতীয়তাবোধসম্পন্ন কবিতা। এই কবিতা যুগের দাবি পূরণ করায় তা জনগণের কাছে সমাদৃত হয়। পরিণত বয়সে তিনি বাল্মীকির রামায়ণের যুদ্ধকা-ের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেন। ‘সেকালের কথা’ নামক আত্মজীবনী গ্রন্থটি তাঁর ব্যক্তিজীবন ও সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের অনবদ্য দলিল হয়ে উঠেছে। যে সমাজে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন, বেড়ে উঠেছেন এবং যুগ যুগ ধরে বসবাস করেছেন, সে সমাজ ছিলো নানা বিধি-নিষেধের ডোরে আবদ্ধ। সেই পশ্চাৎপদ সমাজের মানুষদের তিনি জাগাতে চেয়েছেন। উচ্ছ্বাস, উৎস, বিদ্যুৎ, ছোটদের ছড়া প্রভৃতি রচনায় তাঁর কবিসত্তার মৌলিকতার পরিচয় মেলে। এসব কবিতায় ব্যক্তি-অনুভূতির প্রকাশ যেমন ঘটেছে, তেমনি সমাজ ও দেশের কল্যাণে তাঁর চিন্তাচেতনার ছাপ স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়। ১৯৮৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এই বিপ্লবী নারী ইহলীলা সাঙ্গ করেন।

যে-যুগে বাংলার নারীসমাজ অসূর্যস্পর্শা ছিল, তখন সমাজের বেড়াজাল ছিন্ন করে বাইরে এসেছিলেন আশালতা সেন। স্বীয় কর্ম ও যোগ্যতায় রাজনীতির শীর্ষভাগে আসীন হয়েছিলেন। অগ্নিযুগের দৃপ্ত পদাতিক হিসেবে এই নারী আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলার নারীসমাজকে জাগ্রত এবং সংগ্রামী মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন, লবণ আইন অমান্য আন্দোলন, ভারত ছাড় আন্দোলন এবং সর্বোপরি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই সংগ্রামী নারীর অবদান ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। বারবার কারানির্যাতন, শাসকের রক্তচক্ষু কোনোকিছুই তাঁকে দমাতে পারে নি। স্বজাতি, স্ব-সমাজ ও স্বদেশের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। অগ্নিকন্যা আশালতা সেন ইতিহাসে সত্যিই অমর। বাংলার নারীমুক্তি আন্দোলন, ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে জাতিকে মুক্ত করার আন্দোলনে এই তেজোদীপ্ত নারীর অবদান চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।