পূর্ববঙ্গের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ

By Dr. Abdul Alim on January, 21 2018 with no comments

পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের প্রায় সকল কবিই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে (১৮৬১-১৯৪১) নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। চল্লিশের দশকের প্রবীণ কবিদের থেকে শুরু করে শূন্য দশকের অতি নবীন কবিরাও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। সুফিয়া কামাল, আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, আবুল হোসেন, আবদুল গনি হাজারী, আতাউর রহমান, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আল মাহমুদ, আবুবকর সিদ্দিক, শহীদ কাদরী, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, জিয়া হায়দার, দাউদ হায়দার, মাকিদ হায়দার, জাহিদ হায়দার, কামাল চৌধুরী, অনীক মাহমুদসহ অসংখ্য কবির বিভিন্ন কবিতাগ্রন্থ, পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা বিচিত্র অনুভূতির কবিতা। বাংলা একাডেমি রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ নামে একটি সংকলনও প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশের কবিদের কাছে রবীন্দ্রনাথ সীমাহীন আকাশের মতো। নানা রূপে, রঙে-রেখায়, বিচিত্র অনুভবে তাঁদের অস্তিত্ব জুড়ে তিনি বিরাজমান। ‘সর্বদা তোমার কাছে যাই’, ‘শান্তি দাও আমাদের, আমাদের শান্তির ছায়াকামী’, ‘তুমি নও সীমিত শুধুই কোনো পঁচিশে বৈশাখে’, ‘জীবনে পরাক্রান্ত ফুল’, ‘আর কত দূরে গেলে আমিও সিদ্ধকাম হবো তোমার মতো’, ‘আমার অস্তিত্বে তুমি ঈশ্বরের মতো’, ‘আমার চৈতন্য প্রবাহে তুমি ট্রাফিক আইল্যান্ড’, ‘মাথার ভিতরে তুমি বাবরের মতো ঢুকে গেছো’, ‘আমাদের প্রদীপ্ত বিপ্লব’, ‘আমরতাপৃষ্ট অনুপ্রাণিত কবি’, ‘তুমি তো আমারই একাত্তর, বাংলাদেশ’, ‘অনির্বাণ মহাজ্যেতি সেই এক রবীন্দ্র ঠাকুর/বাঙালি বিশ্বের বুকে অর্বাচীন কালের স্থপতি ;’- এসব পঙ্ক্তিই বলে দেয় পূর্ববঙ্গের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ কীভাবে স্থান পেয়েছেন।

ভক্তি-বন্দনা করা, শ্রদ্ধা নিবেদন করা কিংবা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া মানুষের স্বভাবজাত। আদিম যুগের অরণ্যচারী মানুষ বড় গাছ, উঁচু পাহাড়, জীব-জন্তু, আগুন এবং অলৌকিক নানা শক্তির প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করেছে ; একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শক্তিমানের কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছে। এই শ্রদ্ধা তারা করেছে কতকটা বিস্ময়ে, কতকটা ভয়ে, কতকটা অসীম শক্তির আধার জেনে আবার কতকটা করেছে অন্যের গুণে-কর্তৃত্বে মুগ্ধ হয়ে। বংশানুক্রমিকভাবেই মানবপ্রজাতি পূর্বপুরুষের সেই স্বভাব-বৈশিষ্ট্য যগের পর যুগ বহন করে চলেছে। একালের মানুষও শ্রদ্ধা করে ; তা ভক্তিতে হোক, ভয়ে হোক অথবা আত্মস্বার্থ হাসিলের জন্যই হোক। সাহিত্য জীবনের প্রতিচ্ছবি বিধায় এতেও ভক্তি-বন্দনা ও শ্রদ্ধার ছাপ পরিদৃশ্যমান। মধ্যযুগের কবিরা ভক্তি-বন্দনা দিয়েই কাব্য শুরু করতেন। ¯্রষ্টা থেকে শুরু করে দেব-দেবী-মুনি-ঋষি-শাসক-পির-আউলিয়া-ঠাকুর-পিতা-মাতা সবই তাদের বন্দনায় স্থান পেয়েছে। অনেকে আবার কবিতা রচনার সময় নিজের নামের সঙ্গে প্রতিভাবান বা শক্তিমান কবির নামটি পর্যন্ত গ্রহণ করতেন। আধুনিক যুগের কবিদের মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। মধুসূদন তো কাব্যলক্ষ্মীকে ভক্তি করে তার কাছে বর চেয়েছেন গৌড়জনের পিপাসা নিবৃত্ত করার উপযোগী মহাকাব্য রচনার জন্য। শুধু তাই নয়, তিনি দেশি-বিদেশি অনেক সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম দ্বারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে যারা রথি-মহারথি তাদের অনুকরণ-অনুসরণ কিংবা শ্রদ্ধা করার এই প্রবণতা সাহিত্যরসিক এবং উত্তরসূরি সাহিত্যিকদের মধ্যে থাকে, যাকে প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘মহাজনদের পথ অনুসরণ করা।’ দেশ-কালের সীমার বাইরেও চলে এই অনুসরণ প্রক্রিয়া। মহাজনদের পথ অনুসরণ করতে গিয়েই তাদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়। বাংলাদেশের কবিগণ নানা ভাবে-অনুভবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা-নিবেদন করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্য এবং বাঙালি জীবনে এমন এক অপার বিস্ময়, যাঁকে অনুকরণ-অনুসরণ করার পাশাপাশি তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন তাঁর প্রবল বিরোধিতাকারীরাও। কারণ কোটি কোটি বাঙালির মধ্যে ব্যতিক্রম প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে তিনি যে কথা বলেছিলেন, তা তাঁর নিজের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি বলেছিলেন : ‘মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চর্য ব্যতিক্রম হয় কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে চার কোটি বাঙালি নির্মাণ করিতেছিলেন সেখানে হঠাৎ দুই-একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন। কী নিয়মে বড়লোকের অভ্যুত্থান হয় তাহা সকল দেশেই রহস্যময়Ñআমাদের এই ক্ষুদ্রকর্মা ভীতুহৃদয়ের দেশে সে রহস্য দ্বিগুণতর দুর্ভেদ্য।’ বিধাতার আশ্চর্য নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবেই কোটি কোটি বাঙালির এই দেশে বিশ্বকর্মা বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষ গড়েছিলেন। তাই তাঁর প্রতি মানুষের ঈর্ষা-ভক্তি, স্তুতি-বন্দনা এবং নিন্দা সবই হয়েছে এ দেশে। এক্ষেত্রে শিষ্টজনদের পাশাপাশি অশিষ্টজনরাও কম যান নি। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম, চিন্তা-চেতনা এবং জীবনাদর্শ মানবজাতির অনন্তপ্রেরণার উৎস। বাঙালি-অবাঙালি সকলেই তাঁর সৃষ্টিকর্মে শ্বাশ্বত-অভিব্যক্তির প্রকাশে মুগ্ধ হয়েছে। প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ রবীন্দ্রনাথ লাভ করেছেন নোবেল পুরস্কার। বাঙালির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাঙস্কৃতিক এবং জাতীয় জীবনে তিনি অনিবার্য আলোক-দিশারী। জাতির সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনা আর সংশয় উন্মোচিত চিত্তের দুয়ারে তিনি অনির্বাণ দীপশিখা জ্বালিয়েছেন। তাঁর সৃষ্টির বিশালতায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, অগণিত ভক্ত, শিষ্য ও সাহিত্যানুরাগী তাঁকে শ্রদ্ধ নিবেদন করেছেন। অনেকে ব্যক্তিগত এবং জাতীয় জীবনে রবীন্দ্রনাথকে ত্রাতার ভূমিকায় কাছে পেতে চেয়েছেন। অনেকে তাঁর সৃষ্টিরাজিকে সমালোচনা-বাণে ক্ষত-বিক্ষত করেছেন। কেউ আবার গঙ্গাজলে গঙ্গা-পূজার মতো তাঁর ভাব-চেতনা ও নান্দনিক ঐশ্বর্য দ্বারাই তাঁকে মূল্যায়ন করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ সমকালে এবং পরবর্তী সময়ে বাঙালি-জীবন ও সংস্কৃতির উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। উনিশ শতকের শেষভাগে বঙ্গদেশে জন্মগ্রহণকারী চিন্তাশীল মনীষীরা রবীন্দ্রনাথের মধ্য দিয়েই বঙ্গসংস্কৃতির রসাস্বাদন করেছেন। রবীন্দ্রপ্রতিভার উজ্জ্বল দীপ্তিতে বিমোহিত হয়েছেন অনেকেই ; শুধু তাই নয়, বাংলা সাহিত্যের মননশীল ভাবধারার তিরিশের কবিরাও রবীন্দ্রপ্রভাবকে অস্বীকার করতে পারেন নি। ঐ সময়ের সবচেয়ে শক্তিমান কবি জীবনান্দ দাশ তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা কবিতা’ প্রবন্ধে লিখেছেন :

সকল দেশের সাহিত্যেই দেখা যায় একজন শ্রেষ্ঠতম কবির কাব্যে তাঁর যুগ এমন মানবীয় পূর্ণতায় প্রতিফলিত যে সেই যুগের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পথে যেসব কবি নিজেদের ব্যক্ত করতে চান, ভাবে ও ভাষায়, কবিতার ইঙ্গিতে বা নিহিত অর্থে, সেই মহাকবিকে এড়িয়ে যাওয়া তাঁদের পক্ষে দুঃসাধ্য ব্যাপার।

সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ইউরোপীয় প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমালোচনা করলেও, তাঁকে অস্বীকার করতে পারেন নি ; বরং উচ্ছ্বাস নিয়ে লিখেছেন : ‘কাব্যের আনন্দময় স্বরূপ-সম্বন্ধে তিনিই আমার অদ্বীতিয় দীক্ষাগুরু…।’ তিনি আরও লিখেছেন :

রবীন্দ্রনাথ শুধু বাংলা সাহিত্যের পিতৃ-পদবাচ্য নন, আধুনিক মনোবিজ্ঞানে যে প্রক্রিয়ার নাম আরোপ, তারই সার্বভৌম অভিব্যক্তিতে তিনি প্রত্যেক শিক্ষিত বাঙালীর মানস প্রতিমূর্তি ; এবং রাবীন্দ্রিক ভাষার কালগত সামান্যকীকরণই যদিও এই অদ্বৈতসিদ্ধির মুখ্য হেতু বটে, কিন্তু ভাষা ও অভিজ্ঞতার সংযোগ যেকালে দুñেদ্য, তখন আমাদের ভাবনা-বেদনাও, মোটের উপর তাঁর দৃষ্টান্তে নিয়োজিত।

এভাবে অসংখ্য কবি নিজের স্বকীয়তার মাঝেও রবীন্দ্রনাথের প্রভাব শিরোধার্য করে কাব্য রচনা করেছেন, তাঁর প্রতি ভক্তি নিবেদন করেছেন।

দুই.
পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছিল আত্মার সংযোগ। বছরের পর বছর বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষ ও পারিপার্শ্বিকতার নিবিড় সংস্পর্শে কাটিয়েছেন তিনি। এখান প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে তিনি একাত্ম্য হয়ে গিয়েছিলেন। পূর্ববঙ্গের প্রকৃতি বুকে বসে তিনি অনেক গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ রচনা করেছেন ; বক্তৃতা করেছেন, প্রজাহিতৈষণামূলক নানাবিধ কাজ করেছেন। পূর্ববঙ্গের মানুষের কাছে এভাবেই তিনি আপন হয়েছেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া তুলে পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্র-সংগীত নিষিদ্ধ করেন। পাকিস্তানি সরকারের এই বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করে এ অঞ্চলের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীসমাজ এবং সংস্কৃতি-কর্মীরা রবীন্দ্র-সৃষ্টিকর্মকে আরও আঁকড়ে ধরেন। মূলত, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে গিয়েই পূর্ববঙ্গের মানুষ রবীন্দ্রনাথকে তাদের চেতনা, অস্তিত্ব ও সংগ্রামী প্রেরণার শক্তির উৎসরূপে গ্রহণ করে। ধর্মীয় উন্মাদনায় গড়া পাকিস্তানের সমাধির উপর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার যে বিজয়-পতাকা উড্ডীন হয়, তার বিকাশে রবীন্দ্র-ভাবধারা বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণে রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতা উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে এবং প্রেরণা যুগিয়েছে। বলা যায়, বাঙালির জাতীয জীবনের সকল সঙ্কটে রবীন্দ্রনাথ আবির্ভূত হয়েছেন অনেকটা ত্রাতার ভূমিকায়। সেজন্য এখানকার কবি-সাহিত্যিকগণ নানাভাবে তাঁদের সৃষ্টিকর্মে রবীন্দ্রনাথকে স্থান দিয়েছেন।

রবীন্দ্র-জন্মতিথি বাঙালিজীবনে বয়ে আনে আনন্দবার্তা। প্রকৃতির বুকেও যেন আনন্দের ঢেউ লাগে। এদেশের কবিদের কাছে তা অপার আনন্দের উৎসরূপে পরিগণিত হয়। কবি সুফিয়া কামাল রবীন্দ্র-জন্মতিথিতে নিজের মধ্যে অনুভব করেছেন এক অভাবনীয় পুলক। এজন্য পঁচিশে বৈশাখকে প্রণতি জানাতে তিি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রিয়জনের রেখে যাওয়া বসন্ততরুর শীর্ষের প্রণামকে তিনি নিয়ে আসেন কবিগুরুর জন্মতিথি স্মরণ করতে। তিনি দেখতে পান গাছে গাছে পুষ্পোৎসব আর রবির কিরণে হাসির ছটা। চারিদেকে আনন্দের ঝর্ণাধারা, উৎসবের আমেজ। তৃণের তণূ, পথের ধুলিকণাÑসবকিছুতেই উৎসবের আমেজ। রবি-প্রণামে ব্যস্ত কবি সুফিয়া কামাল লিখেছেন :

তব শুভ জন্মের লগনে
পড়েছে উৎসব সাড়া। ছাইয়াছে গগনে-গগনে
প্রসন্ন রবির কর, তরুশীর্ষ, তৃণের তণুতে
পথে-পথে ধুলির অণুতে।

কবি লক্ষ করেছেন ধরণীমাতার বক্ষ আনন্দে নাচছে। বর্ষিত হচ্ছে আশিস-¯েœহ। বকুলের সৌরভে চারদিক মাতোয়ারা। এক প্রশান্তির ভাব সফিয়া কামালের চিত্ত জুড়ে বিরাজ করে। দিনের প্রথম প্রহরে নবরবির আলোকের ঝর্ণাধারায় পৃথিবীতে যেমন কর্মের যাত্রা সূচিত হয়, তেমনি রবীন্দ্রচেতনায় পরি¯œাত হয়ে তিনি প্রাত্যহিক কর্ম শুরু করেন। প্রতি প্রাতে নবরবি যেন উদিত হয় তাঁর চিত্তে। তিনি অনুভব করেন রবীন্দ্রনাথের দরদমিশ্রিত পরশ ছড়িয়ে আছে সবখানে। সেজন্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি লিখেছেন :

হে কবি। স্বপনচারী অপূর্ব বেদনা শ্লেষে এক
গেয়েছ প্রাণের গান। সৃজিয়াছ কী যে অভিনব
ভঙ্গুর মাটির পাত্রে কী-অমৃত! সুধায় আস্বাদ
লভিয়াছি কণার প্রসাদ।
তাহারি গৌরবে স্মরি হে কবি! নিয়ত তব নাম,
তাই তব জন্মদিনে দূর হতে জানাই প্রণাম।

রবীন্দ্রপ্রতিভার দ্যুতি বিচ্ছুরিত হয়েছে সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায়। তাঁর প্রতিভার বহুমাত্রিক বিন্যাস আর সৃষ্টিবৈচিত্র্যে পূর্ণতা পেয়েছে আমাদের সাহিত্য। তাঁর সৃষ্টির বার্তা পৌঁছে গেছে দেশ থেকে দেশান্তরে। বিশ্বসাহিত্যের আসরে রবীন্দ্রনাথ ঠাঁই লাভ করেন আপন গৌরবে। জগতের লাঞ্ছিত মানবতার পাশে রবীন্দ্র-সাহিত্য মুক্তির গান শোনায়। হানাহানি-ভরা পৃথিবীতে তিনি শান্তি আর সম্প্রীতির বাণী নিয়ে উপস্থিত হন। বস্তুত, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে রবীন্দ্রনাথ পৌঁছে দেন এক বিশাল উচ্চতায়। অহসান হাবীব রবীন্দ্র-প্রতিভার সেই ব্যাপ্তি আর বিশালতার কথাই তুলে ধরেছেন ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতায় তিনি উচ্চারণ করেছেন :

কবিতায় সংগীতে এবং চিত্রে
কী আশ্চর্য দক্ষতায়
সহজে নির্মিত হলো কী বর্ণাঢ্য সম্পন্ন বাগান, যার
ফলে ও ফসলে
আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি
তৃষ্ণার্ত মানব।

সকল সৃষ্টির পেছনেই থাকে কোনো-না-কোনো অনুপ্রেরণা। সাহিত্যের ক্ষেত্র এর ব্যতিক্রম নয়। প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের সাহিত্যভা-ার থেকে উপাদান নিয়ে সমৃদ্ধ হন নতুন যুগের সাহিত্যিকগণ। ‘কবিসার্বভৌম’ রবীন্দ্রনাথের দ্বারাও অনুপ্রাণিত হয়েছেন অগণিত সাহিত্যিক। সৈয়দ আলী আহসানের চেতনায় রবীন্দ্রনাথ ‘শেষহীন আকাশ’ এবং ‘অনেক সজীবতায় হৃদয়ের নীলাম্বর’। যদিও অতিমাত্রায় পাকিস্তানপ্রতির কারণে তিনি এক সময় প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়ার কথা বলেছিলেন, তবুও রবীন্দ্রনাথ নামক কবিতায় তাঁর উপলব্ধিজাত উচ্চারণ :

একদিন আশ্চর্য উষ্ণতায়
শব্দের ঐশ্বর্য পেয়েছি
অতি পরিচিত শব্দ হঠাৎ সমুদ্র হয়েছে
এবং আমার সমস্ত আগ্রহ
চিলের মতো ডানা মেলেছে
এ-সব সত্য ইতিমধ্যেই ইতিহাস
এখন আবার আমাদের শব্দে
নতুন স্বাদ আসছেÑ
নতুন মৃত্যু, বিচার, পদচারণা এবং বিশ্বাসÑ
তুমি আমৃত্যুর সাধনায় এসব সম্ভাবনাকে প্রদীপ করেছো
তাই তুমি আমার আকাশ
এবং শব্দের পরিসরে হৃদয়ের নীলাম্বর।

রবীন্দ্রনাথের ক্ষণিক সান্নিধ্য ও আশীর্বাদ পূর্ববঙ্গের অনেক কবির পথচলার পাথেয় হয়েছে। কবি আবুল হোসেন তাঁদের একজন। দু-বার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে। একবার সরাসরি কথাও বলেছেন। আবুল হোসেন সে-স্মৃতি বুকে আগলে রেখেছেন সারাজীবন। ভীরু-কম্পিত হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথকে তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ স্বীয় ঔদার্যে তাঁকে আশীর্বাদ করেছিলেন, যা তাঁর জন্য শ্রেষ্ট পাওয়া হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আবুল হোসেনের প্রশান্তিময় উচ্চারণ :

হে কবি স¤্রাট,
সেদিন পাঠিয়েছিলে মোরে তব ¯েœহ-আশীর্বাদ
হয়তো সে তব লঘু বৃদ্ধের কৌতুক অথবা সে
ক্ষণিকের আকস্মিক দুর্বলতা অবচেতনার।
তবু আমি তাহারেই আমার বসন্ত-অবকাশে
গণিয়াছি বারবার তব বসন্তের আশীর্বাণী,
জানিয়াছি সুন্দরের তীর্থ পথে তাহারে আমার
পরম পাথেয় বলে, তাহারেই শ্রেষ্ঠ পাওয়া মানি।

রবীন্দ্র-সাহিত্য সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের আহ্বানে মুখর। এর সৌন্দর্য রসিকজন ও সূক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্ন মানুষের চিত্তকে আন্দোলিত করে। বারবার সৌন্দর্য-পিপাসু মানুষ ছুটে যায় রবীন্দ্র-সৃষ্টির কাছে। তার মধ্যে খোঁজে স্বস্তি আর প্রশান্তি। কবি আতাউর রহমান এভাবেই অনুভব করেন রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সৃষ্টিকে। সংগত কারণেই তাঁর লেখনীতে আসে :

সর্বদা তোমার কাছে যাই
যেমন মানুষ যার সুহৃদের কাছে দুঃখের সময়…
মনে হয় তোমার কবিতা
চুরি করা প্রণয়ের দুর্লভ চুম্বন
তাই তার আকর্ষণ
তারা করে ক্ষুধিত সত্তাকে সর্বদাই,
তাই তার অভিসার সুদিনে-দুর্দিনে
রাত্রির অন্ধকারে বৈশাখের ঝড়ে
বর্ষার পিচ্ছিল পথে রক্ষচক্ষু চৈত্রের দুপুরে
অব্যাহত দুর্নিবার –

তিন.
রবীন্দ্রনাথ কেবল কবিই নন, তিনি একজন মানবপ্রেমিক ও চিন্তাশীল মনীষী। বিপদসঙ্কুল মানবজাতির মর্মবেদনা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। সাহিত্যে মানবজীবনের চিরন্তন অভিব্যক্তির প্রকাশ যেমন তিনি ঘটিয়েছেন, তেমনি সেগুলোর মাধ্যমে হতাশাদীর্ণ মানুষকে শুনিয়েছেন আশার বাণী, বিপর্যস্ত মানুষকে যুগিয়েছেন সামনে চলার প্রেরণা ও শক্তি। মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না ও প্রেম-বিরহের সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন তিনি। পৃথিবীর আলো-বাতাস, রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ অসাধারণ কাব্যিক ব্যঞ্জনায় উপস্থাপিত হয়েছে তাঁর সাহিত্যে। জগতের প্রতিটি বিষয় ও বস্তুকে অসম্বব সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে সেগুলোকে মোহনীয় কাব্যসুষমায় সুষমিত করে তুলেছেন। জগতের আলো-বাতাস, প্রকৃতি-মানুষ, সমাজ-সংসার সবকিছুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রাণের সম্পর্ক বিদ্যমান। জগতকে ভালোবাসেন বলেই জীবনের প্রতি তাঁর এত টান : ‘ভালবাসিয়াছি এই জগতের আলো/জীবনেরে তাই বাসি ভাল।’ জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে মানুষকে তিনি অকৃত্রিম ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়েছেন। শত পৈশাচিকতা দেখে শেষ পর্যন্তও তিনি মানুষের প্রতি বিশ্বাস অটুট রেখেছেন। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। মানুষের উপর বিশ্বাস ও আস্থা রেখে উচ্চারণ করেছিলেন : ‘জয় হোক মানুষের/ওই নাবজাতকের, ওই চিরজীবিতের।’ মানবপ্রত্যয়ী রবীন্দ্রনাথের প্রতি বাংলাদেশের কবিদের আস্থা অনেক। মযহারুল ইসলাম রবীন্দ্রসৃষ্টির মধ্যে শান্তির অন্বেষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন :

শান্তি দাও আমাদের, আমরা শান্তির ছায়াকামী
আমরা শান্তির ছায়াকামী
হিংসার বহ্নিশিখা এ মাটিতে আর জ্বালবো না।

হাসান হাফিজুর রহমান রাবীন্দ্রিক অধিকার ‘উঁচু করি ধরি’ আজীবন চলতে চান। জিয়া হায়দারের অস্তিত্ব জুড়ে রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরের মতো বিরাজ করেন। শহীদ কাদরীর চৈতন্যপ্রবাহে রবীন্দ্রনাথ ট্রাফিক আইল্যান্ড। রাতের পার্কে আলো জ্বলা অন্তি রেস্তরাঁ। হুমায়ুন আজাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ অমরতাস্পৃষ্ট অনুপ্রাণিত কবি ও উন্মোথিত প্রেমিকের মতো। অসীম সাহা নিয়তির মতো কিছুতেই অতিক্রম করতে পারেন না রবীন্দ্রনাথকে। শামসুর রাহমানের মনে হয় :

অলৌকিক পদ্মের মতন
তোমার স্মরণ
উন্মোচিত হয়
উদ্ভাসিত হয়
উন্মেলিত হয়
অসংখ্য প্রাণের তীর্থে এবং তোমার
গানে-গানে মৃত্যুর তুহিন শীতে ফোটে
ফোটে অবিরত
জীবনের পরাক্রান্ত ফুল।

রবীন্দ্রনাথ জাতীয ও আন্তর্জাতিক জীবনের নানা সঙ্কটে ভাবিত ছিলেন। তাঁর সময়ে ভারতে অন্যতম প্রধান সমস্যা ছিলো হিন্দু-মুসলিম সঙ্কট। ধর্মান্ধতার প্রকটরূপ দেখে তিনি বলেছিলেন : ‘ধর্ম কারার প্রাচীরে বজ্র হানো/এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।’ ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানের জন্য জ্ঞানচর্চা ও সত্যসাধনা দ্বারা সকলের মানসিকতা পরিবর্তনের কথা বলেছেন। ইউরোপের মানুষের মতো সত্য ও জ্ঞান-সাধনার দ্বারা সঙ্কীর্ণ চিন্তা-চেতনাকে মুছে ফেলতে পারলেই সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তিনি স্পষ্টই বলেছেন : ‘এ সমস্যার সমাধান হবে মনের পরিবর্তনে, যুগের পরিবর্তনে। ইউরোপ জ্ঞানের সাধনা ও ব্যাপ্তির থেতর দিয়ে যেমন করে মধ্রযুগের ভেতর দিয়ে আধুনিক যুগে এসে পৌঁছেছেন। হিন্দুকে মুসলমানকেও তেমনি গ-ীর বাইরে যাত্রা করতে হবে।’ কিন্তু ইউরোপের প্রতি এ আস্থা তিনি বেশিদিন ধরে রাখতে পারেন নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তা-বলীলা এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির পৈশাচিকতা দেখে তিনি বেদনা-ভারাক্রান্ত হয়েছিলেন। যুদ্ধের বিভীষিকা আর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর নিষ্ঠুরতা দেখে মানবদরদী রবীন্দ্রনাথ ইউরোপের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের বর্বরতার প্রতি অভিসম্পাত করে তিনি লিখেছেন : ‘যুদ্ধ-পরবর্তীকালীন ইউরোপের বর্বর নির্দয়তা যখন আজ এমন নির্লজ্জভাবে চারদিকে উদঘাটিত হতে থাকলো তখন এ কথাই বারবার মনে আসে কোথায় রইল মানুষের সেই দরবার যেখানে মানুষের শেষ আপীল পৌঁছবে আজ। … দুর্গতি যতই উদ্ধতভাবে ভয়ঙ্কয় হয়ে উঠুক তবুও মাথা তুলে বিচার করতে পারি, ঘোষণা করতে পারি, তুমি অশ্রদ্ধেয়, অভিসম্পাত দিয়ে বলতে পারি বিনিপাত।’ সকল ভয়-ভীতির উর্ধ্বে মানবের বিজয়-কেতন ওড়ানোর জন্য তিনি মঙ্গলময়ের কাছে প্রার্থনা করেছেন। পূর্ববঙ্গের কবিরা রবীন্দ্রনাথকে দেখেছিলেন জাতির দুর্ভোগ মোচনের কা-ারী হিসেবে। কবি মহাদেব সাহা যুগের সমস্যা-সঙ্কটে বড় অসায় বোধ করেছেন, রবীন্দ্রনাথকে প্রেরণা জেনে উচ্চারণ করেছেন :

রবীন্দ্রনাথ আমাদের আবহমান বাংলাদেশ
আমাদের প্রদীপ্ত বিপ্লব
রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরদিন একুশে ফেব্রুয়ারি
রবীন্দ্রনাথকে আশার আলো আর শক্তির উৎস মনে করেছেন কবি ত্রিদিব দস্তিদার। তিনি লিখেছেন :
তুমি তো আমারই জননীর নির্বাণ নয় মাস
তুমি তো আমার একাত্তর, বাংলাদেশ
হে রবীন্দ্রনাথ

অনেক কবি কেবল পূজার অর্ঘ্য নিবেদন করেই রবীন্দ্রনাথকে কবিতায় স্থান দিতে চান না। রবীন্দ্রনাথের কাছে পান আপন অস্তিত্ব জানান দেওয়ার প্রেরণা। পেতে চান দুর্দিনের দুর্ভোগ লাঘেবের অমোঘ মন্ত্রণা। কবি কামাল চৌধুরী এঁদেরই একজন। রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে তিনি লেখেন :

পূজার প্রদীপ নিয়ে দাঁড়াবার দিন শেষ হলো কবি। আজ শুধু
দুর্দিনে উথাল সাগরে দিকচিহ্নহারা কোনো নাবিকের মতো
পদতলে মাটি খুঁজে বেরাবার দিন
পরম সত্তার মতো সত্য আজ বাস্তবের সকল আঘাত
নিজেকে টিকিয়ে রাখা উপেনের নিজস্ব ভিটেয়
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে বিজয়কেতন আজ ওড়াবার দিন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞের নায়ক। বাংলা কাব্যের আকাশে তিনি মধ্যাহ্ন সূর্যের দীপ্তিতে ভাস্বর। দীর্ঘ আটষট্টি বছর সাহিত্য-সাধনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যের ভা-ার সমৃদ্ধ করেছেন। কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন প্রতিভা বিরল। কবি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখেছেন :

আমি এই ¯্রােতমুখে খুঁজি নিত্যনতুন সংগীত
উন্নত আমার মন, কেমন উজ্জ্বল ধ্রুব জ্বলে,
এও তো তোমরও গর্ব, গর্বে আমি জ্বলেছি যে নিজে।

আবুবকর সিদ্দিক রবীন্দ্রনাথকে জেনেছেন সূর্যসম শক্তির আধার হিসেবে। তিনি লিখেছেন :

মেঘে মেঘে বেলা
যায় না,
তাকে ঘিরে ঘুরি আমরাই
যত পরমাণু
মূলত :
সূর্য
প্রাণের উৎস বাসা।

বেলাল চৌধুরী নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে রবীন্দ্রনাথকে অনুভব করেছেন। অবগাহন করেছেন তাঁর সাহিত্যসাগরে। চিরদিন তিনি রবীন্দ্র-সাহিত্যের আকাশে-বাতাসে পরিভ্রমণ করতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিবেদন করে তিনি লেখেন :

প্রতিদিন অন্তত সহস্রবার
নিঃশ্বাস নিই ঐ বিপুল বিশাল শব্দরাশি থেকে
কম করেও সহ¯্রবার
নির্মল ও বিশুদ্ধ করি ফুসফুসকে
তোমার প্রেমে ও পূজায়
কত না গান কত না শব্দের মঞ্জরী।

রবীন্দ্রনাথ বাঙালি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক বিশাল মহীরুহ। বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি তাঁর প্রতিভার স্পর্শে ঋদ্ধ হয়েছে। বিষ্ণু দে যথার্থই বলেছেন : ‘বস্তুত রবীন্দ্রনাথই আমাদের দেশের শিল্পসাহিত্যে তো বটেই, দেশের সমস্ত সংস্কৃতি, মানস, জীবন ও কর্মের আধুনিকতার আদি ও মৌলিক দৃষ্টান্ত।’ আমাদের শিল্পচেতনা, ব্যক্তিক, পারিবারিক, রাষ্ট্রিক পরিসরে রবীন্দ্রনাথ বড় আপনজন ও প্রেরণার উৎস। ফলে পূর্ববঙ্গের কবিদের চেতনায় রবীন্দ্রনাথ অনিবার্যভাবেই বিরাজ করেন। তাঁদের কবিতার ছত্রে ছত্রে রয়েছে এর অনুপম দৃষ্টান্ত। সত্তর দশকের কবি অনীক মাহমুদ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সনেট রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে তিনি উপলব্ধি করেন শ্বাশ্বত অনুভূতির ব্যঞ্জনায় :

বিশ্বতাই বিমোহিত তাঁর কুঞ্জ সুরপুঞ্জ গানে,
আঁধিয়ারা বাতি যেন হয়ে যায় আলোর অলকা,
সীমার বাঁধন ছিঁড়ে অসীমের দীপ্ত আহ্বানে
রবীন্দ্র সাহিত্য আজ সর্বস্তরে রাধাকান্ত সখা,
যতোদিন মানবের থাকবে কল্পনা অনুভূতি,
ততোদিন রবীন্দ্র মনীষা হবে মায়ার প্রসূতি।

সত্যিই রবীন্দ্রমনীষা ও তাঁর সৃষ্টিরাজি শ্বাশ্বত মানবের চিরায়ত অনুভূতিকে নাড়া দেবে। পূর্ববঙ্গের কবিতায় ‘মহামহিম রবীন্দ্রনাথ’ বিচিত্র অনুভবে স্থান পেয়েছেন। অনাগত কালের কবিদের সৃষ্টিশীলতায়ও তিনি প্রভাব সঞ্চার করবেন। কেবল পূর্ববঙ্গের কবিগণ নন, শ্বাশ্বত-মানব চিরকাল গাইবে রবীন্দ্রনাথের স্তবগান।