মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পীসত্তা : স্বরূপ ও সিদ্ধি-অন্বেষা

By Dr. Abdul Alim on January, 27 2018 with no comments

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) বস্তুবাদী ও জীবনঘনিষ্ঠ কথাশিল্পী। গভীর সংবেদনশীলতা, সমাজ-রাজনীতিমনস্কতা, মনোবিশ্লেষণধর্মিতা, দর্শন ও বিজ্ঞাননিষ্ঠতা এবং সর্বোপরি নর-নারীর সম্পর্কের সহুমাত্রিক জটিলতার রূপায়ণ তাঁর শিল্পীসত্তাকে বিশিষ্টতা দান করেছে। তাঁর শিল্পীমানস মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং সাধারণ নর-নারী ও তাঁদের পারিপার্শ্বিকতার দিকে যেমন ঝুঁকেছে তেমনি ঝুঁকেছে ফ্রয়েড ও মার্কসীয় দর্শনের দিকে। তিনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির আলোকে জীবনের ছবি এঁকেছেন, জীবনজটিলতার গ্রন্থিমোচন করেছেন। মানুষের আদিম প্রবৃত্তি, বিকারগ্রস্ততা, বোহেমিয়ান স্বভাব, কামনা-বাসনা ইত্যাকার বিষয় শৈল্পিক রসমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করেছে তাঁর সাহিত্যে। দৃঢ় মনোবল, প্রচ- প্রাণশক্তি, ডানপিঠে স্বভাব তাঁর শিল্পীমানসকে বলিষ্ঠতা দান করেছে। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে তিনি ‘আট ফর লাইফ সেক’ আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ প্রভৃতিতে তাঁর শিল্পীসত্তার যে বিচরণ, তাতে তিনি জীবনের বাস্তব ও জটিল রূপকেই মূর্ত করে তুলেছেন। তবে এ কথাও সত্য যে, শেষজীবনে তিনি অপার সম্ভাবনার শিল্পীপ্রতিভাকে নিজ হাতেই ‘শেষকৃত্য’ করেছেন :

এত বড়ো শক্তিমান স্রষ্টা এলোমেলো ঝড়োহাওয়ার দ্বারা দিগভ্রান্ত হয়ে কখনও মানুষের জৈবসত্তাকে সম্মুখে স্থাপন করে তার জয়গান করলেন, কখনও বামাচারী শোভাযাত্রার পুরোভাগে ঝা-া হাতে অবতীর্ণ হলেন, প্রগতির নামে উৎকট রাজনীতি ও উদ্ভট সমাজনীতির কচকচির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন – এইভাবে তার শিল্পিজীবনের অপমৃত্যু হল। (অসিতকুমার, ২০০৫ : ৫৬৩)

এতদ্সত্ত্বেও মানিকপ্রতিভা বাংলা সাহিত্যে অদ্বিতীয়। বঙ্কিমচন্দ্রের অতীতচারী রোমান্সধর্মিতা, রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক ভাবালুতা কিংবা শরৎচন্দ্রের সমাজ-সংস্কার শাসিত জীবন-সংবেদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আবির্ভূত হলেন তিনি। কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকদের মতো অতি উগ্র জীবনবোধ ও নিরীক্ষাধর্মী ভাবনা তাঁর লক্ষ্য ছিল না, বরং বাস্তবদৃষ্টিতে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং সমাজের নীচুতলার মানুষের আবেগ-অনুভূতি, জীবনসংগ্রাম, কামনা-বাসনা ও নানামাত্রিক জটিলতাকে তিনি শিল্পরূপ দান করেছেন। জীবনকে যেভাবে দেখেছেন, কোনোরকম রং না চড়িয়ে অকৃত্রিমভাবে এনেছেন বলেই বলতে পেরেছেন :

জীবনকে আমি যেভাবে ও যতভাবে উপলব্ধি করেছি অন্যকে তার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ ভাগ দেওয়ার জন্য আমি লিখি।’ (মানিক, ১৯৯৭ : ১২)

সাহিত্যের সঙ্গে লেখকের জীবন, সমাজ এবং পারিপার্শ্বিকতার নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। চারপাশের দেখা জীবন ও সমাজকে লেখক কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারেন না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শৈশব থেকে গ্রাম-বাংলার আনাচে-কানাচে এবং শহরের গলি-ঘিঞ্জিতে ঘুরেছেন ; জীবনের বাস্তব, নগ্ন ও নির্মম রূপকে প্রত্যক্ষভাবে অবলোকন করেছেন। সে-জীবনকে সাহিত্যে রূপদানের জন্য অনলসভাবে লেখনী সঞ্চালন করেছেন। তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছে :

শৈশব থেকে সারা বাংলার গ্রামে শহরে ঘুরে যে জীবন দেখেছি, নিজের জীবনের বিরোধ ও সংঘাতের কঠোর নগ্ন বাস্তব রূপ দেখেছি – সাহিত্যে কি তা আসবে না? (মানিক, ১৯৯৭ : ৩০)

বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘকাল রূপায়িত হয়েছে অভিজাত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির নর-নারীর জীবনালেখ্য। বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎ সাহিত্যের পুরোভাগে রয়েছে সামন্ত-জমিদার এবং অভিজাত নর-নারীর জীবনের চালচিত্র। এসব নার-নারীর জীবন ফাঁপা, বাস্তবতাবর্জিত এবং কৃত্রিম। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কাছে থেকে দেখেছেন ভদ্রজীবনে কৃত্রিমতার আড়ালে ঢাকা থাকে জীবনের বাস্তবরূপ, অপূর্ণ থেকে যায় মানুষের নানা আশা-আকাক্সক্ষা। নিঃস্ব, খেটে খাওয়া ও অভাবতাড়িত মানুষের সংস্পর্শে এসে মানিক মধ্যবিত্ত জীবনের অসঙ্গতিসমূহ উপলব্ধি করলেন এবং লিখেলেন :

ভদ্রজীবনে অনেক বাস্তবতা কৃত্রিমতার আড়ালে ঢাকা থাকে, গরীব অশিক্ষিত খাটুয়ে মানুষের সংস্পর্শে এসে এই বাস্তবতা উলঙ্গরূপে দেখতে পেতাম, কৃত্রিমতার আবরণটা আমার কাছে ধরা পড়ে যেতো। মধ্যবিত্ত সুখী পরিবারের শত শত আশা-আকাক্সক্ষা অতৃপ্ত থাকায়, শত শত প্রয়োজন না মেটার চরম রূপ দেখতে পেতাম নিচের তলার মানুষের দারিদ্র্য-পীড়িত জীবনে। (মানিক, ১৯৯৭ : ১৯)

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপলব্ধিজাত চেতনা ; অর্থাৎ নিম্নবিত্তের দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত জীবন, জীবনের নেতিবাচক দিক এবং অস্পৃশ্য-অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ সাহিত্যে স্থান পেতে থাকলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে। এ সময় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত এবং দর্শন-বিজ্ঞান-শিল্পকলার নানা তত্ত্ব এবং বাদ-মতবাদের প্রভাবে প্রচলিত মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও সংস্কারে ফাটল ধরলো। কল্লোল (১৯২৩), কালি-কলম (১৯২৬), প্রগতি (১৯২৭), সংহতি (১৯২৪), উত্তরা (১৯২৫) প্রভৃতি পত্রিকার মাধ্যমে নিটোল বাস্তবতা ও জীবনধর্মী সাহিত্য সৃষ্টি হতে থাকলো – এর পুরোভাগে ছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০০-১৯৭৫), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৭৮), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯১৮-১৯৭১), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) প্রমুখ কথাসাহিত্যিক। এঁরা ‘সরে এসেছিল অপজাত ও অপজ্ঞাত মনুষ্যত্বের জনতায়। নিম্নগত মধ্যবিত্তদের সংসারে। কয়লাকুঠিতে, খোলার বস্তিতে, ফুটপাতে, প্রতারিত ও পরিত্যক্তের এলাকায়।’ (অচিন্ত্যকুমার, ১৩৫৭ : ৫১) সমালোচকের ভাষায় :

সমাজের অন্ত্যজ রসাতলের বাসিন্দাদের জীবনবাস্তবতা যেমন তাঁদের সাহিত্যের উপজীব্য হয়েছে, দারিদ্র্য ও কায়ক্লেশপূর্ণ নিম্নমধ্যবিত্তের জীবনবাস্তবতার রূপায়ণেও তাঁরা মনোযোগী হন। (আকিমুন, ১৯৯৩ : ১১৯)

নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং সমাজের নীচুতলার মানুষকে সাহিত্যে স্থান দিয়ে সমসাময়িক অন্যান্য লেখকের মতোই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বাংলা সাহিত্যের বাস্তবতার অভাব খানিকটা’ (মানিক, ১৯৯৭ : ৩১) মিটিয়েছেন। আগেই বলেছি, তাঁর ছিল বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টি। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে এ বিষয়ে পঠন-পাঠন ও আগ্রহ যেমন তাঁর ছিল, তেমনি দর্শন-মনস্তত্ত্বের নানা বিষয় এবং বিশ্বসাহিত্যের অধ্যয়নলব্ধ জ্ঞান মানিকের শিল্পীসত্তাকে ঋদ্ধ করেছে। তিনি নিজেই বলেছেন : ‘আমি ছিলাম বিজ্ঞানের ছাত্র এবং যেমন আগ্রহ নিয়ে বিজ্ঞান পড়তাম তেমনি আগ্রহ নিয়েই আরম্ভ করেছিলাম যৌনবিজ্ঞান, মনস্তত্ব আর বিশ্বসাহিত্য পড়া।’ (মানিক, ১৯৯৭ : ২৬) মানিক উপলব্ধি করেছিলেন বিজ্ঞানের যুগে বাস করে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকাটা সাহিত্যিকের জন্য যথার্থ নয়। অধ্যাত্মবাদী ভাবুকের দৃষ্টি নিয়ে সাহিত্যচর্চা করাকে তিনি যথাযথ মনে করেন নি। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিজ্ঞান প্রভাবিত মন উপন্যাস লেখার জন্য অপরিহার্যরূপে প্রয়োজন।’ (মানিক, ১৯৯৭ : ৫৯) এজন্যই লিখেছিলেন :

সাহিত্যিকেরও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন, বিশেষ করে বর্তমান যুগে, কারণ তাতে অধ্যাত্মবাদ ও ভাববাদের অনেক চোরা মোহের স্বরূপ চিনে সেগুলি কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়। (মানিক, ১৯৯৭ : ৫৭)

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনবাদী লেখক। বাংলা কথাসাহিত্যে বস্তুনিষ্ঠ জীবনের রূপায়ণে তাঁর সমকক্ষতা কেউ অর্জন করতে পারেন নি। অতীতের জীবনাচরণ বা ইতিহাসের মায়াবী হাতছানি তাঁকে টানেনি ; টানেনি বৈদেশিক কোনো পরিম-লও। চোখের সামনে যে জীবন ও পরিবেশ প্রত্যক্ষ করেছেন, তাকে রূপায়িত করেছেন সাহিত্যে। তাঁর শিল্পীসত্তা পরিভ্রমণ করেছে মানবমনের আদিমতার বক্র-কুটিল প্রদেশে। বঞ্চিত, শোষিত তথা সবহারাদের জীবন-ভাষ্যকার রূপেই মানিক স্বকীয়তা লাভ করেছেন। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু মন্তব্য করেছেন :

বর্তমান, প্রত্যক্ষ ও সমসাময়িকের মধ্যেই তিনি (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) আজীবন শিল্পের উপাদান খুঁজেছেন এবং তার যে অংশটিকে শিল্পরূপ দিয়ে গেছেন তা স্বাক্ষর ও বিত্তহীন সর্বসাধারণের সর্বাধিক পরিচিত। এইখানেই তাঁর বৈশিষ্ট্য ও সার্থকতা।’ (বুদ্ধদেব, ১৯৭১ : ৯৯)

০২.
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখকদের ‘নিছক কলম পেষা মজুর’ বলে অভিহিত করলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি নিজেও তা ছিলেন না। কলম পিষে মজুরি পেলেও শ্বাশ্বত-কালের মানুষের জীবনকে শিল্পায়িত করেছেন তিনি, আর এ কারণেই নিছক কলম পেষা মজুরদের চেয়ে তাঁর স্বাতন্ত্র্য। ঊনচল্লিশটি উপন্যাস, ষোলটি গল্পগ্রন্থ-সমেত একাধিক সংকলন এবং নানা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত দু-শতাধিক গল্প, একটি নাটক, কিছু প্রবন্ধ, শিল্পসাহিত্য ও কবিতার মধ্যে তাঁর শিল্পীসত্তার বিশেষত্ব। সেই যে বাজি ধরে ‘অতসী মামী’ গল্প লিখে যাত্রা শুরু করছিলেন, তারপর আর থামতে হয়নি তাঁকে। তাঁর লেখনী সঞ্চালিত হয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে – বিচিত্র পথে। গল্প দিয়ে শুরু করলেও ‘উপন্যাস লেখার দিকে ঝোঁক পড়লো’ তাঁর – লিখে ফেললেন দিবারাত্রির কাব্য আর প্রথম প্রকাশ করলেন জননী উপন্যাস। বিশ্বযুদ্ধোত্তর গ্রাম ও শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত জীবনের কথা স্থান পেলো তাতে। অতি পরিচিত জগৎ, অথচ প্রকাশভঙ্গি একেবারেই আলাদা।

নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি-পরিবারের চিত্র জননী উপন্যাসের শ্যামার সংগ্রামের মধ্যে প্রকাশমান। নেশাগ্রস্ত, বদমেজাজি ও উদাসীন স্বামী শীতল খুনের দায়ে জেলে যায়। সংসারের ঘানি চাপে শ্যামার কাঁধে। যুক্তিনিষ্ঠ দৃষ্টিতে মানিক উপলব্ধি করেছেন :

জননীত্ব কেমন যেন নীরস অর্থহীন মনে হইত শ্যামার কাছে।…পেটের সন্তান গুলির প্রতি শ্যামা যেন বিদ্বেষ অনুভব করিত,- সব তাহার শত্রু, জন্মজন্মান্তরের পাপ! কি দশা তাহার হইয়াছে ওদের জন্য।

এ উপন্যাসে শহরতলীর পরিবেশ ভিন্ন মেজাজে উপস্থিত ; বিভূতিভূষণের রোমান্টিক দৃষ্টি এখানে নেই। মধ্যবিত্ত পরিবারের পুত্রবধূর সঙ্গে শাশুড়ির মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের কথাও এসেছে এ উপন্যাসে। মানসিক বিকার এর চরিত্রগুলোতে ভিন্নতা এনেছে। মানিকের জীবনবাদী চেতনার সার্থক শিল্পপ্রয়াস জননী উপন্যাস। মানিক-গবেষক সরোজমোহন মিত্র বলেছেন :

এই উপন্যাসে কোন ভাবালুতা নেই, প্রচলিত রোমান্স নেই, আছে চিরাচরিত সুখ-দুঃখময় বাঙালী নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এক জননীর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রামের বাস্তব চিত্রণ।’ (সরোজমোহন, ১৩৭৭ : ২৬)

জননীর বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে মানিক লিখেছেন দিবারত্রির কাব্য উপন্যাস। লেখকের নিবেদনে জানিয়েছেন :

দিবারাত্রির কাব্য পড়তে বসে যদি কখনো মনে হয়, বইখানি খাপছাড়া, অস্বাভাবিক তখন মনে রাখতে হবে এটি গল্পও নয়, উপন্যাসও নয়, রূপক কাহিনী।…একটু চিন্তা করলেই বোঝা-যাবে, বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে সীমাবদ্ধ করে নিলে মানুষের কতগুলি অনুভূতি যা দাঁড়ায়, সেইগুলিকেই মানুষের এক এক টুকরো মানসিক অংশ।

এ উপন্যাসে মানবমনের গভীর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখানে প্রেমের কথা বলতে গিয়ে মানিক একটি মেসেজ পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তা হলো, ‘মানুষের জোড়াতালি দিয়েই জীবনের কালটা খরচ করে ফেলতে হয়।’ (হাসান, ২০০৮ : ১০) হেরম্ব, অশোক, সুপ্রিয়া, মাস্টারমশাই, মালতী, আনন্দ প্রভৃতি চরিত্রে অবসাদ ও বিকার প্রবল। ফ্রয়েডীয় দর্শন প্রভাবিত হয়ে এ উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মনোজগতে প্রবেশ করেছেন লেখক। সমালোচক বলেছেন :

ফ্রয়েডীয় মনোবিকলনের উদাহরণ হিসেবে এই উপন্যাসের অধিকাংশ চরিত্রের আবির্ভাব – পরবর্তীকালে লেখকের বহু রচনায় যে অসুস্থ ও অস্বাভাবিক চরিত্রগুলি সৃষ্ট হয়েছে, এখান থেকে যেন তার সূচনা।’ (নিতাই, ১৯৮৬ : ১২৩)

পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা, জীবনের জটিলতা, অমৃতস্যঃ পুত্র প্রভৃতি উপন্যাস মানিকের শিল্পীসত্তাকে কালজয়ী করেছে। নিম্নবিত্ত মাঝি-মানুষদের জীবনের উপাখ্যান পদ্মানদীর মাঝি। এ উপন্যাসের কুবের, গণেশ চিরকালের অবহেলিত মানুষ। ভদ্রপল্লিতে তাদের ঠাঁই নেই ; ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোগ, শোক, বঞ্চনা এঁদের নিত্যসঙ্গী। মানিকের দরদমাখা হাতে আঁকা এ উপন্যাসের কাহিনি স্বদেশের গ-ী অতিক্রম করে বৈশ্বিক পরিম-লে সাড়া জাগিয়েছে। একজন ফরাসি প-িত মন্তব্য করেছেন :

সাধারণ মানুষের আদিম ও অমার্জিত মানবতা, অশিক্ষিত ও কষ্টনিপীড়িত চিরন্তন হৃদয়বেদনা ও গভীরতম প্রবৃত্তির অশান্ত সংঘাত, ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ জীবন পরিধির মধ্যেও অপরিচিত ও অনিশ্চিত পরদেশের অনিবার্য আকর্ষণ ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ বইখানিতে নিখুঁতভাবে রূপায়িত হয়েছে। (পিয়ের, ১৯৭১ : ৬২)

পুতুলনাচের ইতিকথায় গাওদিয়া গ্রামের পরিবেশ ও মানুষকে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা হয়েছে। অনন্তর মুখ দিয়ে লেখক উপন্যাসের মর্মকথা যেন আগেভাবেই জানিয়ে দেন :

সংসারে মানুষ চায় এক, হয় আর এক, চিরকাল এমনি দেখে আসছি ডাক্তারবাবু। পুতুল বই তো নই আমরা, একজন আড়ালে বসে খেলাচ্ছেন।

ডাক্তার শশীকে উপলক্ষ্য করে লেখক পল্লিজীবনের চিরন্তন ছবি এঁকেছেন। বস্তুত, ‘দারিদ্র্যলাঞ্ছিত সাধারণ মানুষের বাস্তব জটিল জীবন এই উপন্যাসে অপূর্ব শিল্পরূপ লাভ করেছে।’ (সরোজমোহন, ১৩৭৭ : ২১৪) মধ্যবিত্তের প্রেমজটিলতা, বেকারত্ব, অভাব-অনটন এসবের আলেখ্য জীবনের জটিলতা উপন্যাস। বিমল, প্রমীলা, অধর ও শান্তার জীবনের জটিল ঘূর্ণাবর্ত এবং বিকারগ্রস্ততাকে বাস্তব-অবাস্তবের মিশ্রণে তুলে ধরেছেন লেখক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিবর্তিত মূল্যবোধ অমৃতস্যঃ পুত্রর অনুপম চরিত্রের মধ্যে স্থান পেয়েছে। ‘আদর্শবানের ছেলের আদর্শচ্যুই’ এ উপন্যাসের মূলকথা। সহরতলী গ্রাম কিংবা শহরের কাহিনি নয়, গ্রামীণ চিত্রের সঙ্গে শহরের ক্লেদপূর্ণ জীবনের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা আখ্যান। মধ্যবিত্তের মনের জটিলতা, অসহায়ত্ববোধ ও কুটিলতা প্রকাশিত হয়েছে যশোদা, জ্যোতির্ময় প্রভৃতি চরিত্রের ক্রিয়াকলাপে। অহিংসায় ধর্ম সম্পর্কে কটাক্ষ করায় বিতর্কের ঝড় ওঠে। প্রচলিত অনেক আচার ও বিশ্বাস সম্পর্কে বস্তুবাদী দৃষ্টিতে প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। গঁৎ-বাঁধা জীবনের কথা আছে ধরা-বাঁধা জীবন উপন্যাসে। ভূপেন, সরমা, প্রভার মনে জীবন সম্পর্কে নানা প্রশ্ন জেগেছে, সদুত্তর মেলে নি।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পীসত্তার গভীরে ক্রমে স্থান করে নিয়েছিল মার্কসবাদ। এজন্য তাঁর শেষ পর্যায়ে রচিত অনেক উপন্যাসে মার্কসবাদ ব্যাপকভাবে বিধৃত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন মার্কসবাদ মানুষের অগ্রগতির যথার্থ পথ দেখাতে পারে। এও বিশ্বাস করেতেন যে, এ বিষয়ে ধারণা না থাকলে সাহিত্যচর্চা যথার্থ গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না। তিনি লেখেছেন :

মার্কসবাদই যখন মানবতাকে প্রকৃত অগ্রগতির সঠিক পথ বাতলাতে পারে – অতীতে কি ছিল, বর্তমানে কি হয়েছে এবং কিভাবে কোন ভবিষ্যৎ আসবে জানিয়ে দিতে পারে তখন মার্কসবাদ সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে সাহিত্য করতে গেলে এলোমেলো উল্টোপাল্টা অনেক কিছু তো ঘটবেই। (মানিক, ১৯৯৭ : ২৬)

দর্পণ, প্রতিবিম্ব প্রভৃতি উপন্যাসে মার্কসবাদী চেতনার প্রভাব স্পষ্ট। দর্পণ মূলত শ্রেণিবিভক্ত সমাজের আলেখ্য। এর একপ্রান্তে লোকনাথ, হেরম্ব, উমাপদ, শশাঙ্ক, হীরেন, দিগম্বরী আর অন্যপ্রান্তে রয়েছে রম্ভা, বীরেশ্বর, মহীউদ্দীন ও শম্ভূ। শোষক হেরম্বর বিরুদ্ধে শোষিত ঝুমুরিয়া গ্রামবাসী বিক্ষোভ করেছে। এ উপন্যাসে আছে হতাশাগ্রস্ত ঘুষখোর দারোগা শৈলেন, আছে বস্তিজীবনের ক্লেদ ও বাগদিপাড়ার জীবনরূপ এবং দেহপসারিণীর কথা। লেখকের বস্তুবাদী দৃষ্টিতে দর্পণ-এ বিম্বিত হয়েছে শোষিত-বঞ্চিত সমাজের উপেক্ষিত মানুষের চিত্র।

সহরতলী উপন্যাসে মানিক ভদ্রলোকের চেয়ে কুলি-মজুরদের মাহাত্ম্যকে বড় করে দেখেছেন। তিনি বলেছেন : ‘ভদ্রলোকেরা নাকি বড় বেশী ছোটলোক…তার চেয়ে কুলি মজুরও ভাল।’ কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শ ও দলের কথা স্পষ্ট হয়েছে প্রতিবিম্ব উপন্যাসে। উপন্যাসের নায়ক তারক ‘পার্টি কমিউনের আলোয় আসল সত্যকে চিনতে পেরেছে।’ মানিক ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন ১৯৪৪ সালে, মৃত্যুর পূর্বের বছর এক পত্রে লিখেছিলেন :

আমি মার্কসবাদী, আমি বৈজ্ঞানিক, আমি সব জানি, সংস্কার বা ভাবপ্রবণতার ধার আমি ধারি না। আমি লড়াইয়ে শ্রমিক শ্রেণীর যোদ্ধা কমিউনিস্ট – আমার হৃদয় পাথর।

এই মার্কসবাদী বিশ্বাস কখনো প্রত্যক্ষভাবে আবার কখনো পরোক্ষভাবে তাঁর সাহিত্যে স্থান পেয়েছে।

ফ্রয়েডীয় ও অস্তিত্ববাদী দর্শনের প্রভাব মানিকের অনেক উপন্যাসে পরিদৃষ্ট হয়। ‘যৌনবিজ্ঞান’ এবং ‘মনস্তত্ত্ব’ বিষয়ে তাঁর পঠন-পাঠন ছিল। পদ্মানদীর মাঝির হোসেন মিয়া, পুতুলনাচের ইতিকথার শশী চরিত্রে অস্তিত্ববাদের প্রভাব স্পষ্ট। অস্তিত্ববাদী দর্শনে ব্যক্তির অস্তিত্বকে বড় করে দেখা হয়। জীবন-সঙ্কটে পর্যুদস্ত মানুষ মুক্তির স্বপ্ন দেখে, বাঁচার পথ খোঁজে। কিন্তু স্বপ্ন যখন বাস্তবের চোরাবালিতে আটকে যায় তখন বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ মানুষের মনে বাসা বাঁধে বিষাদ-বিবিক্তি। অস্তিত্ববাদকে প্রথম সাহিত্যে-দর্শনে স্থান দেন ডস্টয়েভস্কি, নীটশে প্রমুখ মনীষী। বাংলা সাহিত্যে জগদীশগুপ্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের লেখায় অস্তিত্ববাদ জায়গা করে নিয়েছে অনিবার্যভাবে। দিবারত্রির কাব্য উপন্যাসের নায়ক হেরম্ব অস্তিত্ববাদের প্রতিভূ। সে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত, পেশায় অধ্যাপক কিন্তু জীবনের স্থির লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। লেখকের বর্ণনায় :
সে জটিল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। সাধারণ সুস্থ মানুষ সে নয়। তার মন সর্বদা অপরাধী, অহরহ তাকে আত্মসমর্পণ করে চলতে হয়, জীবনে সে এত বেশী পাক খেয়েছে যে তার মাথা সর্বদাই ঘোরে। আনন্দ, পুলক ও উল্লাস সংগ্রহ করা আজ তার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন কাজ।

মানিক-অধীত যৌনবিজ্ঞান তথা ফ্রয়েডীয় দর্শনের প্রভাব তাঁর উপন্যাসে ব্যাপকভাবে স্থান পেয়েছে। দিবারাত্রির কাব্য, পদ্মানদীর মাঝি, চতুষ্কোণ প্রভৃতি উপন্যাস এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাসের পাত্র-পাত্রী এবং আখ্যানের মধ্যে কামপ্রবৃত্তি সরীসৃপের মতো বক্রগতি লাভ করেছে। কুসুম শশীকে বলেছে : ‘আপনার কাছে দাঁড়ালে আমার শরীর এমন করে কেন ছোটবাবু?’ মতির দেহ যে শশীকে আকৃষ্ট করেছে তা স্মরণ করিয়ে লেখক বলেছেন : ‘শশীর মনে হয়, শাড়ীর নমনীয় স্পর্শে মতি ভারি আরাম পাইতেছে।’ পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের প্রয়োগ একাধিক চরিত্রে লক্ষ করা যায়। কুবের ও কপিলা রয়েছে তার কেন্দ্রবিন্দুতে। ঔপন্যাসিক বলেছেন : ‘তার উত্তোলিত দুটি বাহু, মুখের ছলনা ভরা হাসি, বসিবার দুর্নিবার দুর্বিনীত ভঙ্গি সব পাগল করিয়া দিবে কুবেরকে।’ কপিলা কুবেরকে গোলক ধাঁধায় ফেলে দেয়। কুবেরের ‘মাথার মধ্যে একটা ভোঁতা বেদনা টিপটিপ’ করে। এরপর গোছলরতা অবস্থায়, মেলায় যাবার সময় এবং গুপিকে আমিন বাড়ি ডাক্তার দেখাতে গিয়ে কপিলা মূর্তমান হয়েছে কুবেরের সামনে। ‘উগ্র যৌন সর্বস্ববাদী কাহিনী’ স্থান পেয়েছে চতুষ্কোণ উপন্যাসে। এ উপন্যাসের নায়ক বিকারগ্রস্ত যুবক রাজকুমার, যার আত্মস্বীকৃতি :

কারো সঙ্গে আমার বনে না, সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে না। … কি যেন বিকার আমার মধ্যে আছে সরসী, আর দশজন স্বাভাবিক মানুষ যে জগতে সুখে বিচরণ করে আমি সেখানে নিজের ঠাঁই খুঁজে নিতে পারি না। আমার যেন সব খাপছাড়া উদ্ভট।

সরসী, রিণি, মালতী ও রাজকুমারের চতুষ্কৌণিক প্রেম চতুষ্কোণ উপন্যাসের প্লট নির্মাণ করেছে। রাজকুমার নারীর দেহের গঠনের সঙ্গে মনের গঠন বুঝতে চায়। সে বাথরুমে গিয়ে রিণির গোসল করা দেখার আগ্রহ প্রকাশ করে। সরসী বাসায় ডেকে নিয়ে নিজের নিরাভরণ দেহ দেখিয়ে রাজকুমারের কৌতূহল মিটিয়েছে। এ উপন্যাস পাঠ করতে করতে লেখক যেন চলে যায় ডি. এইচ. লরেন্সের উপন্যাসের জগতে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে বিরাজ করে ফ্রয়েডীয় চেতনা। চতুষ্কোণ উপন্যাস সম্পর্কে সমালোচক লিখেছেন :
এ উপন্যাসে যৌন কল্পনার অবাধ ব্যাপ্তি ও বিচরণের, ইহার সূক্ষ্মতম, অনির্দেশ্যতম, খেয়াল-পরিতৃপ্তির উপযোগী প্রতিবেশ আশ্চর্য কলাকৌশলের সহিত রচিত হইয়াছে। (শ্রীশ্রীকুমার, ১৯৯২ : ৫২২)

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনকে পর্যবেক্ষণ করেছেন বিচিত্র অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার আলোকে এবং সে অভিজ্ঞতাকে শিল্পায়িত করে স্থান দিয়েছেন তাঁর উপন্যাসগুলোতে। তিনি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনকে নিয়ে লিখেছেন জীয়ন্ত উপন্যাস। স্বাধীনতার স্বাদ উপন্যাসে তুলে ধরেছেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার চিত্র। মধ্যবিত্ত জীবনের চালচিত্র আছে সোনার চেয়ে দামী উপন্যাসে। এভাবে একের পর এক রচনা করেছেন ছন্দপতন, ইতিকথার পরের কথা, পাশাপাশি, সার্বজনীন, আরোগ্য, তেইশ বছর আগে পরে, ব্যথার পূজা, চাল-চলন, শুভাশুভ, হরফ, পরাধীন-প্রেম, হলুদ নদী সবুজ বন, মাশুল, প্রাণেশ্বরের উপাখ্যান, মাঝির ছেলে, মাটি ঘেঁষা মানুষ প্রভৃতি উপন্যাস। মানবজীবনের নানা সমস্যা-সংকটকে বৈজ্ঞানিক চিন্তার আলোকে বৃহৎ পরিসরে উপন্যাসের ক্যানভাসে তুলে এনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্পীসত্তার শক্তিমত্তাকে প্রকাশ করেছেন।

০৩.
ছোটগল্প সৃষ্টিতে মানিকপ্রতিভার সাফল্য ঈর্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথ যে আর্থ-সামাজিক পটভূমিকে গল্পে স্থান দিয়েছিলেন, শরৎচন্দ্র যে সামাজিক দায়বোধ থেকে ছোটগল্প রচনা করেছিলেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জগৎ তা থেকে ভিন্ন। তিনি অবজ্ঞাত জনতার কাতারে নেমে কৃত্রিমতাকে সম্পূর্ণ পরিহার করে সৃষ্টি করলেন ছোটগল্পের শিল্পকাঠামো। সর্বত্রগামী না হলেও বিচিত্রগামী হয়েছে গল্পকার মানিকের শিল্পদৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ মাটির কাছাকাছি থাকা যে সাহিত্যিকের আগমনী বার্তা শোনার জন্য কান পেতে অপেক্ষা করছিলেন মানিক যেন সেই মাটির কাছের শিল্পী। মাটির কাছাকাছি থেকে সমকালীন জীবনবাস্তবতাকে গল্পে তুলে আনলেন তিনি। বিচিত্র বিষয় ও চরিত্র ভিড় করেছে তাঁর মন-মননের ভূমিতে, গল্পেও ঘটেছে তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। মানিকের গল্পের বিচিত্র প্রবণতা পর্যালোচনা করে আনন্দ ঘোষ হাজরা তাতে কয়েকটি লক্ষণ খুঁজে পেয়েছেন :

(১) মানিকসৃষ্ট চরিত্রের ফ্রয়েডীয় বৃত্তি, অনেক সময় অনিশ্চিত আচরণ, (২) স্পষ্ট রূঢ় দারিদ্র্যের চিত্রাঙ্কন। সেখানেও গল্পকে কখনো নির্দেশাত্মক, কখনো অনির্দেশক করে তোলা। (৩) দুর্ভিক্ষের সময় মূল্য নষ্ট করেও মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য আকাক্সক্ষা ও স্পৃহা। (৪) জীবনের আস্বাদের কথা যে কোনো ধরনের গল্পেই। (৫) গল্পের অতি সরল গঠনপ্রণালী যা কখনো কখনো জটিলতার সীমাস্পর্শও করতে পারে। (৬) পুরুষ প্রধান সমাজে বস্তুস্বরূপা নরীদের স্বাধীনতার লড়াই। (৭) কিছু কিছু গল্পে ম্যাজিক রিয়ালিটির ছোঁয়া। (৮) বেশ কিছু গল্পে দেহবাদের লক্ষণ, যা কখনোই অশ্লীল বলে অনুভূত হবে না। (৯) মানিকের গল্পের নাট্যধর্মিতা। (আনন্দ, ২০০৮ : ১৭)

তিনি কোনো স্থির বিন্দুতে দাঁড়িয়ে গল্প রচনা করেন নি। ধাপে ধাপে স্বীয় উপলব্ধির কথাকে ব্যক্ত করেছেন বিচিত্র ধারার গল্পে। কুঁড়ি থেকে যেভাবে ফুল ক্রমে বিকশিত হয় ‘অতসীমামী’ থেকে তেমনি ক্রমবিকশিত হয়েছে গল্পকার মানিকের প্রতিভা। এক্ষেত্রে সমালোচকগণ পাঁচটি স্তরের কথা বলেছেন :

প্রাথমিক পর্যায়, যখন লেখকের জীবন সম্বন্ধে ধ্যান-ধারণা তৈরি হচ্ছে। এই পর্বের গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প, প্রাগৈতিহাসিক, মিহি ও মোটা কাহিনী। দ্বিতীয় পর্যায় হলো উত্তরণের কাল, যখন লেখকের জীবন সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গী তৈরি হয়েছে এবং মার্কসবাদের দিকে ঝুঁকেছেন। এই পর্বের গল্পগ্রন্থ হলো সরীসৃপ, বৌ, সমুদ্রের স্বাদ। তৃতীয় পর্যায় হলো মার্কসবাদে দীক্ষিত হবার পর। এই পর্বের গ্রন্থ হলো-ভেজাল, হলুদ-পোড়া, আজকাল পরশুর গল্প, পরিস্থিতি। চতুর্থ পর্যায় স্বাধীনতা এবং পরবর্তী অবস্থা। এই পর্বের গল্পগ্রন্থ হলো – খতিয়ান, ছোটবড়, মাটির মাশুল, ছোটবকুলপুরের যাত্রী। পঞ্চম পর্যায় হলো মানিকের সাহিত্য জীবনের শেষ অধ্যায়। এই পর্বে রয়েছে ফেরিওয়ালা ও লাজুকলতা। (অরুণকুমার, ১৩৮৫ : ৭৬)

তবে মানিকের শিল্পীসত্তা বিচারে গল্পের এই স্তরবিন্যাস ততটা আবশ্যিক নয়, কারণ গতিশীল বা উুহধসরপ বলতে যা বুঝায় তাঁর প্রতিভায় তা পরিদৃশ্যমান। বিচিত্র বিষয় গল্পে এলেও মানিকের সকল গল্পের অন্তঃসলীলায় ভাবের একটা অখ- সমগ্রতা লক্ষিত হয়। এ ভাব বস্তুবাদী দার্শনিকের বৈজ্ঞানিকসুলভ প্রজ্ঞার ভাব। সামগ্রিকভাবে দেখলে ব্যক্তির অস্তিত্ব, ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব, বিকার, দারিদ্র্য, জীবনের জটিলতা, বাস্তবতা ও বিচিত্র ক্রিয়াকলাপ মানিকের ছোটগল্পের প্রাণবিন্দু। অতসীমামী ও অন্যান্য গল্প গ্রন্থের দশটি গল্পে শরৎ-প্রভাবিত প্রেমচেতনা থাকলেও নারীর স্বাতন্ত্র্যবোধ, ব্যক্তির বিকারগ্রস্ততা ও অসুস্থতার চিত্র রূপায়িত হয়েছে অভিনবরূপে, যা মানিকের অধিকাংশ গল্পের মূল উপজীব্য। গল্পশিল্পী মানিকের প্রাতিস্বিকতা প্রথম গল্পগ্রন্থে সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক গ্রন্থের গল্পগুলোতে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি, নিষ্ঠুরতা, হতাশা, বিষাদ, অস্তিত্বের লড়াই প্রভৃতি বিষয় স্থান পেয়েছে। গ্রন্থের নাম গল্পের ভিখু আদিমতা ও অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূর্ত প্রতীক, যার সম্পর্কে লেখক বলেছেন : ‘পৃথিবীর যত খাদ্য ও যত নারী আছে একা সব দখল করিতে না পারিলে তাহার তৃপ্তি হইবে না।’ ‘চোর’ গল্পে বাস্তববাদী মানিকের প্রজ্ঞাময় উচ্চারণ : ‘জগতে চোর নয় কে? সবাই চুরি করে।’ মানব-প্রকৃতি নির্ধারণে ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যই যে প্রধান ভূমিকা পালন করে, সে কথা ‘প্রকৃতি’ গল্পে তুলে ধরায় প্রয়াস লক্ষ করা যায়। ব্যক্তিমনের গহীনে ডুব দিয়ে তার বিশ্লেষণ করা হয়েছে ‘অন্ধ,’ ‘ফাঁসি,’ ‘ভূমিকা’ প্রভৃতি গল্পে।

ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণ-তত্ত্ব গভীরভাবে আত্মস্থ করেছিলেন মানিক। মিহি ও মোটা কাহিনী এবং সরীসৃপ গ্রন্থে এ তত্ত্বের প্রয়োগ সফলভাবে ঘটিয়েছেন। ‘হাত’ গল্পে মনোবৈজ্ঞানিক অচেতন মানসের ক্রিয়াকলাপ প্রকাশিত হয়েছে। বিকারগ্রস্ত মানসিকতা ‘ছায়া’ গল্পের নায়কের মধ্যে পরিদৃষ্ট হয়। ‘টিকটিকি’ গল্পে বিজ্ঞানচেতা লেখক প্রচলিত সংস্কার, বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণাকে ব্যাঙ্গবাণে জর্জরিত করেছেন। সরীসৃপ গ্রন্থের ‘সরীসৃপ’ ও ‘মহাকালের জটার জট’ গল্পে আলোকিত সভ্যতার অন্তরালের বিকৃতি জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের আলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘গুপ্তধন’ ও ‘প্যাক’ দুটি সার্থক ছোটগল্প। সংগ্রামী শ্রমজীবী মানুষের পদধ্বনি এ গল্প দুটিকে নতুনমাত্রা দিয়েছে। প্রথম ও মধ্যপর্যায়ে লেখা গ্রন্থগুলোতে মানিক ফ্রয়েডীয় ভাবকে অধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। তবে এটা তিনি বুঝেছিলেন যে, কেবল মনোবিকলন দ্বারা মানবমনের সকল দিক বিশ্লেষণ সম্ভব নয়, তা সত্ত্বেও এসব বইয়ের গল্পে মানিক স্বকীয়রূপে প্রকাশমান। সরোজমোহন মিত্র বলেছেন :

মানিক যে একজন অসাধারণ ক্ষমতাশালী লেখক, পর্যবেক্ষণের তীক্ষèতায়, বিশ্লেষণের সূক্ষ্মতায়, আঙ্গিক কুশলতায়, প্রকাশভঙ্গীর তীর্যকতায় এবং বলিষ্ঠতায় এই পর্বেই তিনি তার প্রমাণ রেখেছেন। (সরোজমোহন, ১৩৭৭ : ১৪৭)

মানিক-প্রতিভার ব্যতিক্রমধর্মী সৃষ্টি বৌ গল্পগ্রন্থ। গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলোর নামকরণ বৈচিত্র্যপূর্ণ। দোকানীর বৌ, কেরাণীর বৌ, সাহিত্যিকের বৌ, বিপতœীকের বৌ, তেজী বৌ, কুষ্ঠরোগীর বৌ, পূজারীর বৌ, রাজার বৌ, উদারচরিতানামের বৌ পৌঢ়ের বৌ, সর্ববিদ্যাবিশারদের বৌ, অন্ধের বৌ, জুয়াড়ির বৌ – এ ধরনের নামই জানান দিচ্ছে নানা পেশা ও শ্রেণির মানুষের মানসিকতার সাথে খাপ খাইয়ে তাদের বৌদের মনের জগত গড়ে ওঠে। দোকানীর বৌ দৌকানীর চেয়েও স্বার্থপর, কেরানীর বৌ কৌতূহলচিত্ত হলেও সর্বদা দ্বিধা-সঙ্কচে ভোগে, বিপতœীকের বৌ সন্দেহপ্রবণ হয়। এভাবে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের বৌয়ের আঁতের কথা টেনে বের করেছেন মানিক, এতে বাঙালির দাম্পত্য-জীবনের জটিল মনঃস্তত্ত্ব সম্পর্কে এক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছে। বৌ গ্রন্থে মনঃসমীক্ষণ-তত্ত্বের কথা আছে।

সমুদ্রের স্বাদ গ্রন্থে আছে ফ্রয়েডীয় যৌনতত্ত্বের প্রয়োগ ও বিশ্লেষণ। তেরটি গল্প স্থান পেয়েছে এ গ্রন্থে। ‘সমুদ্রের স্বাদ’ মানুষের সাধ ও সাধ্যের সমন্বয়হীনতার গল্প। ভদ্রলোকের ভিক্ষুক হওয়ার স্বভাবগত অথচ অবান্তর কাহিনি নিয়ে মানিক রচনা করেছেন ‘ভিক্ষুক’ গল্পটি। বিকারগ্রস্ত নর-নারীর জীবনসত্য ধরা পড়েছে ‘কাজল’ গল্পে। ‘সাধ’ গল্প লিবিডো চেতনায় ঠাসা। সাধু-সন্ন্যাসীরা সংসার ত্যাগ করলেও জৈবিক আবেদন ও কামনা-বাসনাকে ত্যাগ করতে পারেন না। নানা রকম বিকার তাদের আচ্ছন্ন করে রাখে। মানুষের জৈবিক কামনা-বাসনা ; – যার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মানিক ফ্রয়েডের কাছে পেয়েছিলেন। অনেক গল্পের মতো তাঁর ‘সাধু’ গল্পে এর প্রকাশ ঘটিয়েছেন। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা – এগুলো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমকালে ভারতবর্ষের মানুষের জীবনকে বিপন্ন করেছিলো। একজন জীবনবাদী ও সমাজসচেতন কথাসাহিত্যিক হিসেবে তিনি এগুলো উপেক্ষা করতে পারেননি ; বরং বাস্তবরূপ দান করেছেন গল্পের মধ্যে। ভেজাল, হলুদ পোড়া, আজকাল পরশুর গল্প, পরিস্থিতি, খতিয়ান, ছোটবড়, মাটির মাশুল, ছোট বকুলপুরের যাত্রী, ফেরিওয়ালা ও লাজুকলতা গ্রন্থের গল্পগুলোতে যুগের সামূহিক বৈনাশিকতা, ব্যক্তির দুর্ভোগ, শ্রেণিচেতনা ও মার্কসীয় ধ্যান-ধারণার শৈল্পিক প্রকাশ ঘটেছে।

সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, মানিকের গল্পগুলো গতানুগতিক নয়। বিষয়বৈচিত্র্যে, ভাষার সাবলীলতায়, চরিত্রসৃষ্টির দক্ষতায় তাঁর গল্প শিল্পসমৃদ্ধ। রবীন্দ্র-শরৎ পড়া পাঠক যেন হতচকিত হয়ে ওঠেন মানিক-সাহিত্য পাঠ করে। বাস্তবতাবোধ ও রাজনীতি সচেতনতা সত্ত্বেও মানিকের গল্প শিল্পোত্তীর্ণ। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো দোষে-গুণে, প্রেমে-সংগ্রামে, আদিমতা এবং ফ্রয়েডীয় চেতনায় অনন্য। নাটকীয় আবহ সৃষ্টি, ভাষার অন্তর্বয়ন এবং শব্দচয়নেও তাঁর গল্প অভিনব।

০৫.
কথাসাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি ও প্রসিদ্ধি লাভ করলেও মানিক-প্রতিভার পরিচয় অপূর্ণ থেকে যায় তাঁর কবিতা ও কবিত্বের প্রসঙ্গ উল্লেখ না করলে। বিশ্বসাহিত্যের অনেক লেখক ; বিশেষ করে ম্যাক্সিম গোর্কি, ইভান তুর্গিয়েনেফ, ডি.এইচ. লরেন্স, হার্ডি কবিতা রচনা করলেও তা তাঁদের কথাসাহিত্যের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে ; মানিকের বেলাতেও তাই ঘটেছে। জীবদ্দশায় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মাত্র সাতটি কবিতা প্রকাশ হয়েছিল তাঁর। মৃত্যুর চোদ্দ বছর পর ১৯৭০ সালে যুগান্তর চক্রবর্তী মানিকের খাতা থেকে বাছাই করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা নামে গ্রন্থ প্রকাশ করেন। যুগান্তর চক্রবর্তীর এ গ্রন্থ প্রকাশের ফলে অনুসন্ধিৎসু পাঠক ও গবেষকের দৃষ্টিতে উন্মোচিত হলেন কবি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘যদিও পুতুলনাচের ইতিকথা, জননী, সহরতলী, ছন্দপতন, স্বাধীনতার স্বাদ প্রভৃতি গ্রন্থে ঔপন্যাসিকের মধ্যে একটি কবি-মন উপলব্ধি করা যায়।’ (শুদ্ধস্বত্ব, ১৯৭১ : ১৩০) কবিতার শিল্পধর্ম সম্পর্কে তাঁর স্বচ্ছ ধারণা ছিল। এ অভিপ্রায় তিনি ব্যক্ত করেছিলেন যে, ‘সাধ করলে কবি হয়তো আমি হতেও পারি ;’ (মানিক, ১৯৯৭ : ৫৭) কিন্তু শেষ অবধি কথাসাহিত্য চর্চাতেই মগ্ন থেকেছেন। সমালোচক বলেছেন : ‘জীবনের রসঘন কবিতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন গদ্যে, অর্থাৎ গদ্যকাহিনীতেÑগল্পে, উপন্যাসে।’ (হায়াৎ, ২০০৮ : ২৮০)

কবিতা সম্পর্কে মানিকের স্বচ্ছ ধারণা যেমন ছিল তেমিন নিজস্ব একটা বক্তব্যও ছিল। কবিতা রচনাকে তিনি প্রসববেদনার সাথে তুলনা করেছেন। দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীর সংলাপের মধ্যে ঘটেছে এর বাস্তব প্রকাশ :

– প্রসববেদনা কেমন জানো?
হেরম্ব জোর দিয়ে বলল, জানি।
জানো, পা গল নাকি, তুমি কি করে জানবে!
– আমি এককালে কবিতা লিখতাম যে মালতী বউদি!

পুতুলনাচের ইতিকথায় কবি হওয়ার ক্ষেত্রে মূল সংকট যে ঠিকমতো বাঁচতে না জানা, তা ব্যক্ত করেছেন চরিত্রগুলোর কথোপকথনের মাধ্যমে :

– কবিতা লিখিস, আঁ?
– না, ঠিকমতো বাঁচতেই জানি না, কবিতা লিখব।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিশোর বয়সে পদ্যের সুললিত ভঙ্গিতে এবং ছন্দের চারুত্বে বন্ধুকে এক পত্র লিখেছিলেন। সে পত্রে নিজের কবিতাচর্চার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর শিল্পীসত্তার বিশেষ দিক মূল্যায়নে ঐ পত্র গুরুত্ববহ। তিনি লিখেছিলেন :

জানো তো কবিতা লেখা কুঅভ্যাস কিছু ছিল মোর,
এখনো ছাড়িতে তাহা পারি নাই আমি একেবারে, –
সে ভূত কায়েমী হয়ে চাপিয়ে রয়েছে মোর ঘাড়ে,
– অর্থাৎ যে নেশা ছিল এখনো কাটেনি তার ঘোর।

স্বাধীনতার স্বাদ উপন্যাসে লিখেছেন : ‘আমি কবি, শুঁড়ি নই’। তাঁর এই কবিত্ব প্রখর যুক্তি আর প্রবল বাস্তববোধের ভূমি স্পর্শ করেছে। গল্প-উপন্যাস সর্বদা আত্মগত ভাব প্রকাশের বাহন হতে পারে না, তার জন্য প্রয়োজন কবিতার। জীবন ও সমাজের বিচিত্র অসঙ্গতি এবং মূল্যবোধের বিপর্যয় সম্পর্কে ব্যক্তির তাৎক্ষণিক উপলব্ধির প্রকাশ ঘটে কবিতায়। পারিপার্শ্বিক জগৎ সম্পর্কে ব্যক্তিমনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ কবিতায় যত সহজে ও সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ করা যায় অন্যত্র তা সম্ভব নয়। সাধারণ জীবন এবং পারিপার্শ্বিক জগতের বর্ণনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উচ্চারণ করেছেন :

অবজ্ঞার খোয়া-তোলা যতেœ গড়া সাধারণ পথ।
এক প্রান্তে রিজার্ভ-জমিতে
ভবিষ্যতের শব-সমারোহ, সমাধি-ফলক, পুষ্পিত শ্রদ্ধার্ঘ্য,
অন্যপ্রান্তে ছোট-ছোট নিঙ্কর-জমিতে
ভদ্র গৃহন্থের
একতলা দোতলা বন্দীশালা।
[‘উত্তর দক্ষিণ’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা]

মানিকের কবিতা বিষয়বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ না হলেও এতে কবির আত্মবিকাশের ইতিহাস, সমাজ ও ইতিহাস-সচেতন বিপ্লবী মনের প্রকাশ এবং নানা বিষয় স্থান পেয়েছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কবি জীবন-বাস্তবতাকে তুলে এনেছেন কবিতায়। সমাজের অস্পৃশ্য-অবহেলিত শ্রেণির প্রতি গভীর বেদনা তাঁর কবিসত্তার মর্মমূলে বিরাজমান ছিল। হাড় কাঁপানো শীত নিবারণের বস্ত্র যাদের নেই তাদের কাছে ধর্মগ্রন্থের পাতা পুড়িয়ে শীত নিবারণ করা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। জীবনের এই বাস্তবরূপের বর্ণনায় তাঁর উচ্চারণ :

বেদ বাইবেল কোরান কিনেছে
শিশি বোতলের বিক্রিওলা,
পুথির পাতা পুড়িয়ে আরাম করবে শীতের রাতে
ফুটপাতে।

সুকান্ত ভটআচার্যের মতো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কবিতাকে লড়াইয়ের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। সমাজের অবিচার, শোষণ, বঞ্চনা, অর্থনৈতিক অনটন, শাসক-শোষক শ্রেণির অত্যাচার ও অন্যায়ের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে তাঁর কবিতা :

আমার জনতা,
আজো জন্মে উলঙ্গিনী ক্ষুধার জঠরে,
না-খেয়ে মরে না,
জমে না ঠা-ায়,
গলে না উল্লাসে শত জারজের উচ্ছিষ্ট স্নেহ তাপে
উচ্চকিত রাজপথে রিলিফখানার ডাস্টবিনে।
সর্বহারা ক্ষুধাতুর প্রাণ,
বিশ্বজয়ী আশা নিয়ে ঘৃণা করে যায়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানবতাবাদী কবি ও জীবনবাদী লেখক। ‘কবিরূপে তিনি হতে চেয়েছেন মানুষের কবি। …বলতে চেয়েছেন জীবনের কথা। ভালোভাবে বাঁচার কথা।’ (তরুণ, ২০০৮ : ৪১) নিঃস্ব মানুষের করুণ চিত্র হৃদয়ের সকল সহানুভূতি দিয়ে তিনি অঙ্কন করেছেন :

মেছুনির ধার করা পাতলা শাড়ি,
ছায়া শেমিজ নেই।
পানওলা আড়চোখে নজর রাখছে,
বাবুদের পোয়া ছটাক মাছ কেনা।
* * *
তবু, পানওলা তার দেহের লাভের নিয়ন্তা।
সাধ ছিল তার হবার,
সস্তা নেই চলতি সাধও পানওলাটির অসুখে
চিরদিনের তরে বিসর্জন। [শিরোনামহীন কবিতা সংখ্যা : নয়]

অলঙ্কার-বৈভব ও শব্দের বৈচিত্র্যে মানিকের কবিতা অসাধারণত্ব লাভ করেছে। যদিও কবিতাগুলো শিল্পমানে সর্বাংশে সফল হয়নি, তবুও তাঁর সাহিত্যকে যথাযথভাবে উপলব্ধি জরার জন্য এগুলো বিশেষভাবে সহায়ক, এমনকি ব্যক্তি মানিকের মনের জগতকে বুঝার জন্যও কবিতাগুলোর পঠন-পাঠন অত্যাবশ্যক। এ প্রসঙ্গে অজিত বাইরী লিখেছেন :

কবিতার প্রধান গুণ শব্দে শব্দে বিবাহ, যেটা তিনি বহুক্ষেত্রেই করতে পারেননি। তাঁর তীক্ষè তীব্র উচ্চারণ কখনও কখনও চমকে দিলেও কবিতায় রসোত্তীর্ণ হয়নি। তবু তাঁর কবিতা আমাদের পড়তে হবে গদ্যসাহিত্যকে অনুধাবন করার জন্য। নিবিড়, তন্ময় মুহূর্তের মানিককে জানার জন্য। (অজিত, ২০০৮ : ১১১)

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কবিতায় উপমা এবং রূপকল্প যেমন সৃষ্টি করেছেন, তেমনি ভাষা ও শব্দচয়নে স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘কাঁকরের মতো চাল’, ‘লেলিহান শিখার মতো পুঁইডগা’, ‘জলঠোসা ব্রণের মতো’ – এ জাতীয় উপমা সত্যিই ব্যতিক্রম। মানিকসৃষ্ট কবিতার রূপকল্পও অসাধারণ। যেমন – ‘দয়ার শোষণে শুভ্র পাটের মুকুট’, ‘শীতে মরা উপবাসী বাঁকা চাঁদখানি’, ‘অর্জুনের সিফিলিস উর্বশীর রুজি’ প্রভৃতি। শব্দ ব্যবহারেও তিনি প্রাতিস্বিকতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রান্ত-ফ্রান্ত, বিস্কুট-ফিস্কুট, ভাতার-পুতের, আলুনি-সংগ্রাম, যৌবন-চিকন, সাঙাৎ ; – এ জাতীয় শব্দ বরীন্দ্রযুগের বাংলা কাব্যে ভিন্নমাত্রা এনেছে। কবি মানিক রবীন্দ্র-ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ভাবোদ্দীপনা নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন – ভাবে, ভাষায়, শব্দে, অলঙ্কারে ; সর্বত্রই তিনি নতুনত্ব সৃষ্টি করেছেন। নিতাই বসু লিখেছেন :

মানিকের কাব্যে রবীন্দ্রনাথের বিন্দুমাত্র প্রভাব নেই। ভাবে তো নেই-ই, ভাষায় শব্দচয়নে উপমা প্রয়োগে অলঙ্কার বিন্যাসে মানিক সম্পূর্ণ মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। (নিতাই : ২৮৯)

কথাসাহিত্যিক মানিকের কাছে কবি মানিক অনুজ্জ্বল হলেও মৌলিক। কাব্যচর্চায় স্থিরভাবে মনোনিবেশ করলে বোধ করি কবি হিসেবেই তিনি সর্বাধিক খ্যাতি লাভ করতেন। অন্যান্য সাহিত্যের মতো কবিতাতেও মানিক সমাজ-সচেতনতা এবং রাজনীতি-মনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে ‘কবিতাগুলি পড়ার পর তাঁর কবিত্ব সম্পর্কে কোনো সন্দেহ জাগে না ; বরং উচ্চস্বরে ঘোষণা করতে হয় যে, তিনি কবিও বটেন।’ (শুদ্ধস্বত্ব : ১৩১) রাজনীতি সচেতন হলেও মানিকের কবিত্ব উঁচুমানের। সমালোচক যথার্থই বলেছেন :

মানিক বাবুর কবিতায় রাজনীতির প্রভাব বেশী, সমাজ-সজ্ঞানতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর সর্বত্র, – তথাপি কবি হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব যে তিনি কোথাও বক্তব্যসর্বস্ব প্রচারবিদ হন নি, ঋজু বলিষ্ঠ উদাত্তকণ্ঠ হয়েও কবিত্বে দীক্ষিত হয়েছেন তিনি।’ (শুদ্ধস্বত্ব : ১৩১)

০৬.
‘স্টাইল ইজ দ্য ম্যান’ বলে ইংরেজিতে একটি কথা আছে। ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি শিল্পী-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রেও এ কথা অধিক মাত্রায় প্রযোজ্য। সব সাহিত্যিকেরই নিজস্ব একটা স্টাইল থাকে ; বক্তব্য উপস্থাপনায়, স্বকীয় চিন্তা-চেতনায়, ভাষা ও শব্দের স্বতন্ত্র প্রয়োগমহিমায় এই নিজস্বতা তার সৃষ্টিকর্মের মধ্যে দৃশ্যমান। আলালী গদ্য, হুতোমী ভাষা, বীরবলী ঢং – এগুলো লেখকের নিজস্ব স্টাইলের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। বঙ্কিমের আলাদা স্টাইল আছে, রবীন্দ্রনাথের আছে, প্রমথ চৌধুরীর আছে, আছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও। তাঁর ভাষাশৈলী গল্প-উপন্যাসের বক্তব্যকে, পাত্র-পাত্রীর ক্রিয়াকলাপকে ভিন্ন মেজাজে উপস্থাপন করেছে। আবেগের সংযমে, বক্তব্য উপস্থাপনের সরলতায়, আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগে, সাধু-চলিত রীতির সৃষ্টি-নৈপুণ্যে, উপমা-চিত্রকল্পের ব্যবহার-বৈচিত্র্যে মানিকের গদ্যশৈলী স্বকীয়তা লাভ করেছে। বিমল কর লিখেছেন :

মানিকের গদ্যের মুখ্য বৈশিষ্ট্য সরলতা এবং সংযম। আবেগঘেঁষা ভাষাকে অত্যন্ত নির্দয়ের মতন তিনি বাদ দিয়ে গেছেন। অথচ কাজ করার সুযোগ বা সাধ্য যে তাঁর ছিল না এমন নয়। (বিমল : ১৮২)

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গদ্য বাস্তবঘেঁষা। ‘ভাষাকে তিনি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন বাস্তবকে শান দেবার পাথর হিসেবে, যাতে বাস্তব পাৎলা হয়, সূক্ষ্ম হয়, আগুনের মতো উজ্জ্বল তপ্ত হয়, আর তাতে দেখা দেয় ক্ষুরের ধার।’ (হাসান, ১৯৯৪ : ৭৯)

জীবনবাস্তবতাকে সাহিত্যে রূপদান করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছেন সাধু ভাষাকে। চলিত রীতির ব্যবহারেও তাঁর দক্ষতা কম ছিল না। তাঁর সাহিত্যে উভয় রীতির দৃষ্টান্ত :

ক. তাঁর মনে হল, সারাদিনের ব্যর্থ চেষ্টার পর এতক্ষণে হেরম্ব তাকে আশ্রয়চ্যূত করে দুঃখ হতাশার স্রোতে ভাসিয়ে দিতে পেরেছে।
[দিবারাত্রির কাব্য]

খ. সুবর্ণকে শ্যামা যেন বুকের মধ্যে লুকাইয়া রাখিয়া একটি দিনের প্রতীক্ষা করিতে লাগিল, কোথায় গেল ক্ষুদ্র বিদ্বেষ, তুচ্ছ শক্রতা। সুবর্ণের জীবন লইয়া শ্যামা যেন বাঁচিয়া রহিল। [জননী]

সাহিত্য-সৃষ্টির শুরু থেকেই মানিক আবেগবর্জিত গদ্য ব্যবহার করেছেন। দৃশ্যমান বাস্তবকে উপস্থাপন করতে তিনি খুব সাধারণ শব্দ ও ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন ; তাতে কোনো নীরিক্ষা নেই, আছে বাস্তবতা :

শহরের নির্জন উপকণ্ঠে সাদা বাড়িটি পার হয়ে হেরম্বের মনে হল, এইখানে শহর শেষ হয়েছে। … পথের দু’পাশে খোলা মাঠে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে বলে রাখালেরা গরুগুলিকে একত্র করছে। পথ সোজা এগিয়ে গিয়েছে সামনে। [দিবারাত্রির কাব্য]

বাস্তবগন্ধী গদ্য রচনা করলেও মানিক কাব্যিকতা একেবারে পরিহার করতে পারেন নি, কেননা কাব্যিক ভাষা সৃষ্টির ক্ষমতা তাঁর ছিল। বস্তুত, কথাসাহিত্যের মাধ্যমে তিনি জীবনেরই কাব্য সৃষ্টি করেছেন। পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসে জেলেপাড়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন :

জীবন অতিবাহিত হয়। ঋতুচক্রে সময় পাক খায়, পদ্মার ভাঙন ধরা তীরে মাটি ধ্বসিতে থাকে, পদ্মার বুকে জল ভেদ করিয়া জাগিয়া ওঠে চর, অর্ধশতাব্দীর বিস্তীর্ণ চর পদ্মার জলে আবার বিলীন হইয়া যায়। জেলেপাড়ার ঘরে ঘরে শিশুর ক্রন্দন কোনোদিন বন্ধ হয় না। … জীবনের স্বাদ এখানে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসায়, কাম ও মমতায়, স্বার্থ ও সংকীর্ণতায়।

তাঁর ভাষার মধ্যে ‘তীক্ষè আত্মসচেনতা’র পাশাপাশি আছে শ্বাশ্বত-কালের জীবনাভিব্যক্তির প্রকাশ। এতে মানিকের নিজস্ব শৈলী স্পষ্ট। জটিলতাপূর্ণ জীবনের আঁকাবাঁকা ভাবনাগুলো তাঁর ভাষার শরীর জুড়ে থাকে। আধুনিক মানুষের বক্র-কুটিল জীবনের মতো এ ভাষা যেন জটিলতা নিয়েই উপস্থাপিত হয় :

মৃত শাদা ইলিশ মাছ, মাছের চকচকে আঁশ, তাদের নিষ্পলক চোখ। কুবের এসব দেখতে পায় না, দেখতে পেলেও তাঁর কোনো ছবি তার চেতনায় নেই। পদ্মার জেলে মাছ ধরে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, হয়তো হাজার বছর ধরে। [পদ্মানদীর মাঝি]

এতে চিরকালের আবেদন যেমন আছে তেমনি আছে গভীর বাস্তবতাবোধ। তিনি শ্লেষধর্মী অনেক বাক্য তৈরি করেছেন, সেগুলোকে মনে হয় ‘যেন ছোট ছোট ইস্পাতের ফলা, বিষ মাখানো তীরের মুখ’। পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাসের শুরুতেই আছে : ‘খালের ধারে প্রকা- বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কঠাক্ষ করিলেন।’ তাঁর ভাষাশৈলী ‘শৈল্পিক সংগঠনে অর্থময়’। (পার্থপ্রতিম, ২০০৮ : ২২) উপমা, চিত্রকল্প ও বিচিত্র ধরনের শব্দ সে ভাষাকে কারুকার্যময় করেছে। তিনি ছিলেন মূলত একজন আধুনিক কথাশিল্পী। ‘সাহিত্যের বিষয়চিন্তা, উপকরণ-আহরণ, গঠনশৈলী ও অলংকারসজ্জা সর্বত্রই তাঁর আধুনিক চেতনার পরিচয় স্পষ্ট।’ (আজিজুল, ১৯৯৮ : ৩৯) তাঁর ‘উপমা ও চিত্রকল্পসমূহ অনাবশ্যক, মেধাহীন কিংবা অনায়াস-সৃষ্ট নয়। একদিকে তাঁর সুগভীর মানবজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণিক ক্ষমতা, অন্যদিকে শিল্পগত পরিমিতিবোধ তাঁর উপন্যাসে উপমা ও চিত্রকল্পগুলোকে বিশিষ্টতা দিয়েছে।’ (বায়তুল্লাহ, ২০০৮ : ১১৫-১১৬) ‘দোকানের মতো ঘর’, ‘জাদুঘর মিউজিমের মতো মানুষের শোবার ঘরে’, ‘সংকেতের মতো একটি স্টিমার’, ‘বিরাট ঠোঁটের মতো দুটি বাঁশে বাঁধা’, ‘জোঁকের মতো’, ‘প্রথার মতো’, ‘দশটা নিয়মের মতো’, ‘শবের মতো’, ‘নীলাভ মণির মতো’, ‘বিরাট ঠোঁটের মতো’, ‘বর্ষার পদ্মার মতো’, ‘বাঁশের কঞ্চির মতো অবাধ্য কপিলা ; উপমার এ রকম দৃষ্টান্ত অনেক পাওয়া যাবে মানিকের কথাসাহিত্যে। চিত্রকল্প সৃষ্টিতেও তিনি সার্থকতা লাভ করেছেন। পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাস থেকে একটি দৃষ্টান্ত :

সুবচনীর হাটের ভিতর দিয়া আমিন বাড়ির পথ। হাটের শূন্য চালাগুলি খাঁ খাঁ করিতেছিল, পথের ধারে স্থায়ী দোকান ও আড়তগুলি শুধু খোলা আছ। একট খাবারের দোকানের পাশে নড়বড়ে বেঞ্চিটাতে কুবের বসিয়া পড়িল।

তৎসম, তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহারে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কথাসাহিত্যের ভাষাকে বৈচিত্র্যসমৃদ্ধ করেছেন। বিশেষ করে, আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহারে তাঁর কৃতিত্ব অতুলনীয়। জবর, জিগা, নামব, হালার, জুত, জিরাই, লাইগা, সারাডা, খেপ, তিনডা – এ জাতীয় শব্দের ব্যবহার বিশেষ অঞ্চলের ভাষা সম্পর্কে লেখকের গভীর দক্ষতারই প্রকাশ। মানিক পূর্ববঙ্গের পদ্মতীররর্তী মাঝি-মানুষদের ভাষা যথাযথভাবে আয়ত্ত্ব করেছিলেন বলেই কুবের, গণেশ, নকুল, কপিলা, রাসু ও মালার মুখে তা হুবহু তুলে ধরতে পেরেছেন :

নকুল : ‘শ্যাষ রাইতে তর বৌ খালাস হইছে কুবির।’
গণেশ : ‘জিরানের লাইগা মরস ক্যান ক দেহি? বাড়িত গিয়া সারাডা দিন জিরাইস। আর দুই খেপ দিয়া ল।’
কপিলা : ‘পোলাপানের লাখান কইর না মাঝি, ছাড়-রাস্তার মদ্যি, ইডা কেমনতর কা-ু জুড়লা?’

এ শৈলী একান্তই মানিকের। নিজস্ব ভাষারীতির জন্যই তিনি বাংলা কথাসাহিত্যে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছেন। বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের গদ্যরীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজের, ভিন্ন ধাঁচের গদ্য সৃষ্টি করেছেন তিনি। তাঁর ভাষাশৈলীর মূল্যায়নে সমালোচক লিখেছেন :

ঝঙ্কারহীন শাব্দিকবিলাসশূন্য একটি নির্ভীক নিস্তাপ ভাষারীতি সৃষ্টি করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আবার প্রমাণ করলেন লেখকের নিজস্ব ভাবনার ফসল, স্বাতন্ত্র্যের ছাপ মুদ্রিত না হলে কোন ভাষায় সাহিত্য-সৃষ্টি করা যায় না। বুদ্ধদেব বসুর গদ্যের কাব্যিক মেজাজ, অচিন্ত্যকুমারের গদ্যের শব্দোচ্ছ্বাস, তারাশঙ্করের সাংকেতিকতা কিংবা বিভূতিভূষণের রহস্যময়তার সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরুচ্ছ্বসিত বৈজ্ঞানিক গদ্যরীতির মেজাজের কোন মিল নেই, আপাত সাধারণ আবেগহীন মন্থর ভঙ্গীতে তিনি প্রবেশ করেছেন জীবনের গভীরে, প্রচলিত ভাবনার ছক ভেঙে ফেলে সহিষ্ণু-সমবায়িতার ভিত্তিমূলে। (চিত্রাদেব, ১৩৮৫ : ৪১)

০৭.
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পীসত্তা আমাদের বিস্মিত করে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যেভাবে রবীন্দ্রপ্রতিভার বিশালতার দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন, তেমনি মানিকপ্রতিভার বিশালতার দিকে তাকালে আমাদেরও বিস্ময়ের অন্ত থাকে না। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও শৈল্পিক দায়বদ্ধতা উভয় দিক থেকেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যকে ঐশ্বর্যপূর্ণ করেছেন। সাহিত্য কেবল কল্পনার রঙিন ফানুস নয়, জীবনবাস্তবতারই শৈল্পিক প্রকাশ, এ কথার প্রমাণ তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যকৃতির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। জীবনের অতল প্রদেশে প্রবেশ করে গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তির দ্বারা তাকে সাহিত্যে রূপদান করা, এ সত্যিই মানিকপ্রতিভার এক অভিনব দিক। উপন্যাস-ছোটগল্পের আখ্যানভাগে, চরিত্রগুলোর ক্রিয়াকলাপে, ভাষার মর্মমূলে বাস্তবতাকেই তিনি উপজীব্য করেছেন। বৈজ্ঞানিকের বস্তবসম্মত পর্যবেক্ষণ শক্তি, দার্শনিকের অন্তর্দৃষ্টি, সাহিত্যিকের নান্দনিক চিন্তা – সবই মানিকের ছিল। এ কারণে তাঁর সাহিত্য এত বস্তুনিষ্ঠ, জীবনঘনিষ্ঠ ও শিল্পসমুন্নতিসম্পন্ন হতে পেরেছে। বাংলা সাহিত্যে তিনি অবিনশ্বর। তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যরাজির দীপ্তি আজও অম্লান এবং তা দ্যুতি ছড়াবে বহুকাল।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৩৫৭)। কল্লোল যুগ। ডি.এম. লাইব্রেরী। কলকাতা
আকিমুন রহমান (১৯৯৩)। আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ। বাংলা একাডেমী। ঢাকা
অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (২০০৫)। বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত। মডার্ণ বুক এজেন্সী। নতুন সংস্করণ। কলকাতা
নিতাই বসু (১৯৮৬)। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাজজিজ্ঞাসা। দে’জ পাবলিশিং। কলকাতা
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৯৭)। লেখকের কথা। নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা
শ্রীশ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৯২)। বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা। মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড। নবম পুনর্মুদ্রণ সংস্করণ। কলকাতা
সরোজমোহন মিত্র (১৩৭৭)। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও সাহিত্য। গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা
সৈয়দ আজিজুল হক (১৯৯৮)। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প : সমাজচেতনা ও জীবনের রূপায়ণ। বাংলা একাডেমী। ঢাকা

সহায়ক প্রবন্ধ
অজিত বাইরী (২০০৮)। ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিধাগ্রস্থ কবিসত্ত্বা’। বৈশাখী। ধ্রুবজ্যোতিম-ল [সম্পাদিত]। কলকাতা
অরুণকুমার রায় (বৈশাখ, ১৩৮৫)। ‘ছোটগল্পে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’। বর্ণমালা (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্মরণ সংখ্যা)। শীতলচন্দ্র ঘোষ ও অরুণকুমার রায় [সম্পাদিত]। কলকাতা
আনন্দ ঘোষ হাজরা (২০০৮)। ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প : পরিপ্রেক্ষিত ও উপাদান’। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শতবার্ষিক স্মরণ। ভীষ্মদেব চৌধুরী, সৈয়দ আজিজুল হক [সম্পাদিত]। অবসর। ঢাকা
চিত্রাদেব (বৈশাখ, ১৩৮৫)। ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গদ্যরীতি’। বর্ণমালা। শীতলচন্দ্র ঘোষ ও অরুণকুমার রায় [সম্পাদিত]। কলকাতা
তরুণ মুখোপাধ্যায় (২০০৮)। ‘কবি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’। বৈশাখী। ধ্রুবজ্যোতিম-ল [সম্পাদিত]। কলকাতা।
পিয়ের ফালোঁ এস. জে. (১৯৭১)। ‘বিদেশীর শ্রদ্ধানিবেদন’। মানিক বিচিত্রা। বিশ্বনাথ দে [সম্পাদিত]। কলকাতা
বায়তুল্লাহ কাদেরী (২০০৮)। ‘মানিকের উপন্যাসে উপমা-চিত্রকল্প’। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শতবার্ষিক স্মরণ। ভীষ্মদেব চৌধুরী, সৈয়দ আজিজুল হক [সম্পাদিত]। অবসর। ঢাকা
বিমল কর (১৯৭১)। ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গদ্যরীতি’। মানিক বিচিত্রা। বিশ্বনাথ দে [সম্পাদিত]। কলকাতা
বুদ্ধদেব বসু (১৯৭১)। ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’। মানিক বিচিত্রা । বিশ্বনাথ দে [সম্পাদিত]। সাহিত্যম। কলিকাতা
শুদ্ধসত্ত্ব বসু (১৯৭১)। ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা’। মানিক বিচিত্রা। বিশ্বনাথ দে [সম্পাদিত]। কলকাতা
হায়াৎ মামুদ (২০০৮)। ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা : যাপিত জীবন’। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শতবার্ষিক স্মরণ। ভীষ্মদেব চৌধুরী, সৈয়দ আজিজুল হক [সম্পাদিত]। অবসর। ঢাকা
হাসান আজিজুল হক (১৯৯৪)। ‘ভাষারীতি : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। কায়েস আহমেদ [সম্পাদিত]। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। ঢাকা
পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় (২০০৮)। ‘উপন্যাসের ভাষা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’। বৈশাখী ধ্রুবজ্যোতিম-ল [সম্পাদিত)]। কলকাতা
হাসান আজিজুল হক (২০০৮)। ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা-গদ্য বস্তবের ভিতর-পিঠ’। কালি ও কলম। আবুল হাসনাত [সম্পাদিত]। পঞ্চম বর্ষ, নবম সংখ্যা। ঢাকা

প্রথম প্রকাশ : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জন্মশতবর্ষ স্মারক, বাংলা বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা, ২০০৮ ]