লেখার কথা

By Dr. Abdul Alim on February, 12 2018 with no comments

লেখার কথা বলতে গেলে প্রশ্ন জাগে লেখা এল কোথা থেকে? এ প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ লেখা আকাশ থেকে পড়েনি কিংবা বের হয়নি মাটি ফুঁড়ে। মানুষই লেখা আবিষ্কার করেছে। সেটা তাকে করতে হয়েছে প্রয়োজনের তাগিদে। নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে। একদিনে দুই দিনে নয়―বহুযুগের সাধনা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে।

আমরা যখন কথা বলি, তখন সে-কথা বাতাসের তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে অন্যের কানে গিয়ে পৌঁছায়। তা দেখা যায় না, শোনা যায়। কানে যে ভাষা শোনা যায়, সেই শোনা ভাষাকে চোখের সামনে প্রকাশ করার নাম লেখা। (সুনীতিকুমার, ২০০৮ : ২) শোনা কথা মানুষের অনুভূতিকে নাড়া দেয় কিন্তু তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কেবল অন্যের কথাই নয়, নিজের উপলব্ধি এবং অনুভূতিও ধীরে ধীরে মন থেকে মুছে যায়। সেজন্য শ্রুতিগ্রাহ্য ধ্বনিকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করতে এবং স্থায়ীরূপ দিতে শুরু হয় মানুষের অভিযাত্রা। ধ্বনিবিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল হাই বলেছেন : ‘ভাষা মানুষের মুখে ধ্বনিরূপে ফুটে ওঠে এবং উচ্চারিত হওয়া মাত্রই তা শূন্যে মিলিয়ে যায়। সেজন্য ধ্বনিকে কোনো রূপের মাধ্যমে ধরে রাখবার, তাকে প্রতীকে চিহ্নিত করার জন্য মানুষের প্রয়াসের অন্ত নেই।’ (হাই, ১৯৯৩ : ২৭০)

প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষেরা নিজের কোনো অভিজ্ঞতাকে পর্বতের গায়ে এবং পাথরের উপর এঁকে বা খোদাই করে রাখত। দশ বারো হাজার বছর আগেকার মানুষ (এবং এখনকার দিনেও যে মানবগোষ্ঠী সেই প্রাগৈতিহাসিক মানসিক অবস্থায় রয়েছে তারাও) ছবি এঁকে উল্লে¬¬¬খযোগ্য বস্তু ও ঘটনাকে প্রকাশ করত (এবং করে)। (সুকুমার, ১৯৯৬ : ২৪) সেই থেকে শুরু হল লেখার ইতিহাস। প্রাগৈতিহাসিক কালের গুহাচিত্রে অঙ্কিত ছবি পাওয়া গেছে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার নানা দেশে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার আদিম অধিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে ছবি এঁকে ভাব প্রকাশের রীতি প্রচলিত ছিল।

দুই
সভ্যতার চাকা যতই সামনের দিকে অগ্রসর হয়েছে ততই অগ্রসর হয়েছে লেখার ইতিহাস। মানুষের ভাবনা পরিশীলিত হওয়ার সাথে সাথে তাকে স্থায়ী রূপদান করতে প্রয়োজন হয়েছে লিপির। ঠিক কোন শুভক্ষণে মানুষ লিখতে শুরু করেছিল, তার সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ কিংবা তারিখ জানা যায় না। অনুমান করা হয়, ‘আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ লেখার উদ্যোগ-আয়োজন আরম্ভ করে। যে দুটি অঞ্চলে লেখার প্রাথমিক উপক্রম দেখা গিয়েছিল তার একটি হল তাইগ্রিস ও ইয়ুফ্রেতিস নদীর মধ্যবর্তী ব্যাবিলন অঞ্চল, যা বর্তমান ইরাকের অন্তর্গত ছিল ; আর একটি নীলনদের পলি-সমৃদ্ধ মিশরদেশ।’ (পবিত্র, ২০০৪ : ২৫)

লিপির বিবর্তন হয়েছে ধাপে ধাপে। প্রথম পর্যায়ে মানুষ ছবি এঁকে মনের ভাবকে স্থায়ীরূপ দিতে চেষ্টা করে। এছাড়া কোনো ঘটনাকে স্মরণ রাখার জন্য দড়ি বা সুতোয় গিঁট দিয়ে রাখত। স্বর্ণ কিংবা যুদ্ধ বুঝাতে লাল সুতো এবং রৌপ্য কিংবা শান্তি বুঝাতে সাদা সুতো ব্যবহার করত। এভাবে গিঁট দিয়ে ভাব প্রকাশের রীতি গ্রন্থিলিপি বা কুইপু নামে পরিচিত।
পরবর্তী ধাপ চিত্রলিপি―এতে বস্তুর প্রতীক হিসেবে আঁকা হতো চিত্র। প্রাচীন মিশরে এই চিত্রলিপির প্রচলন ছিল। এ লিপিকে বলা হয় হায়রোগ্লিফিক্স। এর পরের ধাপ ভাবলিপি। ভাবলিপিতে চিত্রের মাধ্যমে ভাবের প্রকাশ ঘটানো হতো। রাত বুঝাতে অর্ধ বৃত্তের নিচে তারা এবং দিন বুঝাতে অর্ধ বৃত্তের নিচে সূর্য আঁকা হতো। পরের স্তর চিত্রপ্রতীক। এতে পুরো চিত্র না এঁকে কোন কিছুকে বুঝানো হতো বিশেষ চিহ্ন দিয়ে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে উদ্ভব ঘটেছে শব্দলিপি, অক্ষরলিপি এবং ধ্বনি বা বর্ণলিপির। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত সাতটি প্রাচীন লিপির সন্ধান পাওয়া গেছে। তার মধ্যে দুটির অর্থ আজও উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি।

বাংলা লিপির উদ্ভব হয়েছে ব্রাহ্মীলিপি থেকে। ব্রাহ্মীলিপি ভারতের মৌলিক লিপি এবং পরবর্তী ভারতের প্রায় সমস্ত লিপি এই ব্রাহ্মী লিপি থেকেই জন্মলাভ করেছে। (অসিতকুমার, ১৯৯৫ : ১৩৫) সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে ব্রাহ্মীলিপি প্রচলিত ছিল। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে এর বিবর্তন শুরু হয়। এরপর ক্রমে কুষাণ লিপি, গুপ্ত লিপি, পূর্বাঞ্চল লিপি ও কুটিল লিপির ভেতর দিয়ে বাংলা লিপির উদ্ভব ঘটে। বানান ও বর্ণ উভয়কেই সুস্থিত সুশৃঙ্খল সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রথম প্রয়াস লক্ষ করা যায় আঠার শতকের আটের দশকে। হ্যালহেডের (১৭৭৮) ব্যাকরণে বাংলা উদাহরণ ছাপার জন্যে উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকার যে-দিন ছাঁচে ঢালেন বাংলা বর্ণমালা, সেদিন শুরু হয় বাংলা বর্ণমালার আধুনিক রূপের যুগ। (হায়াৎ, ২০১১ : ৬০৫) উনিশ শতকে মুদ্রণযন্ত্রের ব্যাপক প্রচলনের পর বাংলা হরফ একটি সুনির্দিষ্ট রূপ লাভ করে। (কাইউম, ২০০০ : ১৭৩) এই বাংলা হরফ যুগে যুগে বাঙালির ভাবকে লিখিতরূপ দানে সহায়তা করেছে এবং জন্ম দিয়েছে বিশ্বমানের সাহিত্য। সাধু ও চলিত গদ্যরীতির গতিময় তরঙ্গে বাংলা ভাষা লাভ করেছে আন্তর্জাতিক মান। শুধু তাই নয়, এ ভাষার সৃষ্টি হয়েছে প্রমিত বা মানসম্মত রূপ।

তিন
লেখার উদ্ভব ও বিবর্তনের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে কতকগুলো উপকরণ। গাছের পাতা, পাথর, ইট, কাঠ, কাপড়, চামড়া, বিভিন্ন ধাতু, কাগজ, কালি, কলম, রঙ-তুলি, মুদ্রণযন্ত্র, টাইপমেশিন, কম্পিউটার, প্রিন্টার ইত্যাদি উপকরণ লেখা সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছে। ভূর্জপত্র, তালপাতা, তেরেটপাতা ইত্যাদিতে লেখা পা-ুলিপি ভারতবর্ষে পাওয়া গেছে। কাষ্ঠ-ফলক, ধাতব পাত, শিলা এবং ইটে উৎকীর্ণ লেখার নিদর্শনও প্রচুর পাওয়া গেছে। এ দেশে লেখার উপকরণে কাগজ যোগ হয়েছে অনেক পরে। সম্ভবত, খ্রিষ্টীয় এগার শতকে সুলতান মাহমুদ গজনী ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম কাগজের প্রচলন করেন।

লিখন পদ্ধতিতে কলমের ব্যবহার বহু পুরানো। এ দেশে আগেকার দিনে কঞ্চি, শর, নলখাগড়া, পাখির পালক, লোহা ও কাঠের তৈরি লেখনী বা কলমের ব্যবহার ছিল। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির স্পর্শে কলম নিত্যনতুন রূপলাভ করেছে। লেখা সৃষ্টিতে কাগজ-কলমের সঙ্গে নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে কালির। মহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত দোয়াতাকৃতির পাত্রই প্রমাণ করে প্রাচীন কাল থেকে এদেশে কালির প্রচলন ছিল। প্রাচীন পা-ুলিপিতে কালো কালির ব্যবহার বেশি লক্ষ করা যায়। কোনো কোনো পা-ুলিপিতে লাল কালিরও ব্যবহার পরিদৃষ্ট হয়। বর্তমানে লেখার ক্ষেত্রে কত প্রকার কালি যে ব্যবহার করা হয়, তার ইয়ত্তা নেই। কালি ও কলমের সঙ্গে মানবমনের নিবিড় সংযোগের ফলেই সৃষ্টি হয় লেখা। বাংলা প্রবাদে আছে :

কালি কলম মন
লেখে তিন জন। (কাইউম, ২০০০ : ১৯)

কখনও কখনও শিল্পীর তুলির আঁচড়ে রঙ-রেখায় লেখা হয়ে ওঠে অপূর্ব সৌন্দর্যের শিল্পপ্রতিমা। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির জাদুর ছোঁয়ায় লেখা পেয়েছে অভিনব গতি। এখন সুইচ টিপ দিলেই বের হয় নানা রঙের লেখা। শুধু কী তাই? এখনকার দিনে চোখের পলকে লেখা চলে যায় পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কম্পিউটার, ফ্যাক্স, ই-মেইল এবং মোবাইলের বদৌলতে মনের একান্ত গোপন কথাটিও প্রিয়জনের কাছে উপস্থিত হয় লেখার আকারে। সেই যে প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ নিজের অনুভূতিকে ধরে রাখতে ছবি আঁকার মাধ্যমে লেখার শুভসূচনা করেছিল ; তারপর থেকে কত চেষ্টা, কত সাধনা যে এর জন্য করা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। সকল সাধনার সম্মিলিত প্রয়াসেই লেখা আজকের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।

চার
লিখতে গেলে প্রয়োজন হয় বানানের। বানান শব্দটির উৎস সংস্কৃত শব্দ ‘বর্ণন’ থেকে। ইংরেজিতে বানানকে বলা হয় ংঢ়বষষরহম ; বাংলায় বানান হলো শব্দমধ্যস্থ বর্ণসমূহের বিশ্লে¬ষণ বা ক্রমিক বর্ণন। (শৈলেন্দ্র, ১৯৯৬ : ৪৯০) এতে প্রতিভাসিত হয়ে ওঠে একটি বস্তু বা ভাব বা ক্রিয়ার মূর্তি বা প্রতিমা বা তার সংকেত। (আচার্য, ১৯৯৭ : ১) এই বর্ণ-বিশ্লে¬ষণ বা বর্ণের ক্রমিক বর্ণন শুদ্ধ হওয়া জরুরি। শব্দের বর্ণ-বিশ্লে¬ষণের ক্রমের বিপর্যয়ে বা অন্য কোনো ভুল বর্ণের প্রয়োগে সমগ্র শব্দচিত্র বা শব্দ-সংকেত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একইসাথে বিপর্যস্ত হয় শব্দার্থের ব্যঞ্জনা। এ কারণে শব্দের প্রকৃত অর্থব্যঞ্জনার প্রতি লক্ষ করে উচ্চারণশুদ্ধতা যেমন দরকার, শব্দের বানান বা ক্রমিক বর্ণ-বিশ্লেষণের শুদ্ধতাও তেমনি অপরিহার্য।

‘বানান’ শব্দটি নিয়ে সংস্কারপন্থী এবং রক্ষণশীল প-িতদের মধ্যে এক সময় ব্যাপক তর্কযুদ্ধ হয়েছিল। ‘একদিকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধকারী দলের মুখপাত্র অধ্যাপক শ্রীদেবপ্রসাদ ঘোষ আর অন্যদিকে অমিতপ্রতিভা সর্ববিদ্যাবিশারদ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তূণের অন্যতম শরনিক্ষেপ বানান শব্দের বানান নিয়ে।’ (হারুন, ২০১১ : ৩৭) সংস্কার সমিতি পরিষ্কারভাবে বলে দিলেন, ‘বানান’ শব্দের বানান লিখতে হবে ‘দন্ত্য-ন’ দিয়ে―‘মূর্ধন্য-ণ দিয়ে নয়। রক্ষণশীলরা প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, বর্ণন শব্দের তদ্ভব রূপ হবে ‘বাণান’―‘বানান’ নয়। তাঁরা প্রশ্ন তুললেন, যেহেতু মূল শব্দের মধ্যবর্তী হরফটি মূর্ধন্য-ণ, তাই দন্ত্য-ন ওর ঘাড়ে চাপবে কোন যুক্তিতে? সংস্কারপন্থীরা জবাব দিলেন, ‘আমরা ভাষাকে জলবৎ তরলং করার পথই যখন ধরেছি তখন কোনো জটিলতার আবরণ সেখানে থাকবে না।’ তাই এ জাতীয় তদ্ভব শব্দে (যেমন―স্বর্ণ>সোনা, কর্ণ>কান, অগ্রহায়ণ>অঘ্রান, গৃহিণী>গিন্নি) কেবল দন্ত্য-ন ব্যবহৃত হবে। পরবর্তীতে এ যুক্তিই প্রতিষ্ঠা পায়। এভাবে ‘বর্ণন’ থেকে ‘বানান’ শব্দটি সৃষ্টি হয়।

ভাষাকে শুদ্ধ করে লেখার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হচ্ছে বানান শুদ্ধ করে লেখা। যদিও বানানের ক্ষেত্রে এই শুদ্ধ কথাটি অনেকাংশেই আপেক্ষিক, কারণ আজ আমরা যে-বানানকে শুদ্ধ বলছি―দশ, বিশ, পঞ্চাশ কিংবা একশ বছর পরে তাকে অন্য রূপান্তরে শুদ্ধ বলা হতে পারে। পৃথিবীর কোনো ভাষায়ই বিজ্ঞানসম্মত বানান নেই; আর চরম অর্থে শুদ্ধ বলেও কোনো বানান নেই―যে-বানান গৃহীত, তাই শুদ্ধ ; আর যা গৃহীত নয়, যতই যুক্তিসংগত হোক না কেন, তা অশুদ্ধ। (হায়াৎ, ২০১১ : ৬০৫) যুগ, সময় ও পরিবেশের উপর ভিত্তি করে সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তন ঘটে ভাষা, ভাষার উচ্চারণ এবং বানানেও। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যখন যেটা প্রয়োজন এবং যেটা সর্বাধিক সমর্থিত ও গ্রহণযোগ্য তা-ই শুদ্ধ বলে পরিগণিত হয়।

পাঁচ
বাংলা বানান শুদ্ধতার প্রশ্ন ওঠে আধুনিক যুগে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের কবি এবং লিপিকরগণ বানানে সমতাবিধান করতেন বলে মনে হয় না। কারণ এক পা-ুলিপির সাথে আরেক পা-ুলিপির বানানে পার্থক্য আছে। শুধু তাই নয়, পার্থক্য আছে একই লেখকের পা-ুলিপির বানানেও। এর ফলে বানানের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা। আধুনিক যুগে বাংলা গদ্যের বিকাশ ও উৎকর্ষের ফলে জ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো বাংলা ভাষা নিয়ে প-িতগণ নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। সংস্কৃত ও ইংরেজি ব্যাকরণের মিশ্রণে বাংলা ব্যাকরণ রচনার প্রচেষ্টা শুরু হয়।

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত তৎসম শব্দগুলো সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুশাসন মেনে চললেও অ-তৎসম শব্দের বানান ব্যবহারে সমস্যা দেখা দেয়। এর নিরসনকল্পে প-িতগণ বানান সংস্কারে উদ্যোগী হন। গত শতকের বিশের দশকে বিশ্বভারতীর উদ্যোগে চলিত ভাষার বানানের একটি নীতি প্রণীত হয়। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এই বানানরীতি প্রণয়ন করেন, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তা দেখে দেন। ১৯২৬ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঐ বানানরীতি অনুমোদন করেন। প্রশান্ত মহলানবিশের প্রচেষ্টার বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত ‘রবীন্দ্র-রচনাবলী’ ঐ বানানরীতিতেই ছাপা হয়। বাংলা বানান সংস্কারের প্রাথমিক উদ্যোগ এটাই।
এর পরের ধাপ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরোধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বানান সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। রাজশেখর বসুকে সভাপতি এবং চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যকে সম্পাদক করে একটি সমিতি গঠন করা হয়। এ-সমিতির সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৩৬ সালের ৮ই মে বাংলা বানানের নিয়ম প্রকাশিত হয়। ১৯৩৭ সালের মে মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবর্তিত বানানরীতির পরিমার্জিত তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। (শিবপ্রসন্ন, ১৯৮৮ : ৯০) বাংলা বানানে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গৃহীত নিয়মাদি সেকালে বিপ্ল¬বাত্মক ছিল। (হাই, ১৯৯৩ : ২৮৭)

ছয়
দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আরবি, উর্দু ও রোমান হরফে বাংলা চালুর চেষ্টা করলে পূর্ব-বাংলার সচেতন বাঙালি বুদ্ধিজীবীসমাজ তা নস্যাৎ করে দেন। ১৯৪৯ সালে বাংলা ভাষা সংস্কারের জন্য মৌলানা আকরম খাঁকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠিত হয়। ‘বিভিন্ন সময়ে এই কমিটির সম্পাদক ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা, শেখ শরফুদ্দীন ও আবু সাঈদ মাহমুদ। ১৯৫০ সালের ৭ই ডিসেম্বর পূর্ব বাংলা ভাষা কমিটি সরকারের কাছে তাদের রিপোর্ট দাখিল করে। এই রিপোর্টে কমিটি বাংলা ভাষাকে সংস্কার করে মুসলমানী করার বিভিন্ন কায়দা কানুন বাতলে দিয়েছিল।’ (মনসুর, ১৯৯৪ : ২৬০) রিপোর্ট প্রকাশিত হলে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী বাংলা একাডেমিতে দীর্ঘ প্রবন্ধ পাঠের মাধ্যমে তা অন্তঃসারশূন্য বলে প্রমাণ করেন।

১৯৬৩ সালে সৈয়দ আলী আহসানের নেতৃত্বে বাংলা বানান সংস্কারের জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি বাংলা বর্ণমালা থেকে ঙ, ঃ, ঙ্গ এবং ঈ-কার বাদ দেওয়ার সুপারিশ করে। এর কয়েক বছর পর ১৯৬৭ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্ল¬াহ্র একান্ত আগ্রহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিষদ একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির উদ্দেশ্য ছিল বাংলা বানান, ব্যাকরণ ও বর্ণমালা সংস্কার ও সরলায়ন। ১১ মাস পরে কমিটি তাদের সুপারিশ পেশ করে। তবে সে সুপারিশ কখনও প্রকাশিত হয় নি। ‘যতদূর জানা যায় এই কমিটিও বাংলা বর্ণমালা থেকে ঈ, ঊ, ঐ, ঔ, ঙ, ঞ ণ, ষ এবং ঈ-কার, উ-কার, ঐ-কার এবং ঔ-কার ইত্যাদি বর্জন, যুক্তবর্ণের উচ্ছেদ, ব-ফলা, ম-ফলা, ও য-ফলার পরিবর্তে বর্ণদ্বিত্ব গ্রহণ, জ-য এবং স-শ ব্যবহারের জন্য নিয়ম উদ্ভাবন, এ-কার এবং ই-কারকে ব্যঞ্জনের ডান পাশে বসানোসহ কয়েকটি উদ্ভট প্রস্তাব ঐ সুপারিশের অন্তর্ভুক্ত ছিল।’ (জামিল, ১৯৯৪ : নয়) ১৯৬৮ সালে মুহম্মদ এনামুল হক, মুহম্মদ আবদুল হাই ও মুনীর চৌধুরী ঐ সংস্কার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে বলা হয়―‘বাংলা লিপি ও বানান সরলায়ন ও সংস্কারের কোনো আশু প্রয়োজন নাই। এইরূপ কাজে হাত দিলে নিশ্চিতরূপে ভ্রান্তি বিভ্রান্তিতে পরিণত হইবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের ভাষার দ্রুত উন্নয়ন বিশেষভাবে ব্যাহত হইবে।’ (আনিসুজ্জামান, ১৯৯৪ : ৫৮)

১৯৮০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা বানানের নিয়ম সমিতি’ বাংলা বর্ণমালা থেকে ঙ, ঞ, ণ, ঈ-কার এবং য-ফলা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করে। তবে তা কার্যকর হয় নি। পরবর্তীকালে অনেকেই বাংলা বানান সংস্কারের প্রস্তাব করেন। ১৯৯১ সালে আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশ করে ‘বাংলা কী লিখবেন কেন লিখবেন।’ ১৯৯২ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রকাশ করে ‘পাঠ্য বইয়ের বানান’ পুস্তিকা।

বাংলা বানানকে প্রমিত তথা ‘সর্বজনগ্রাহ্য’ করার লক্ষ্যে ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির রিপোর্ট এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতামতের ভিত্তিতে ১৯৯৪ সালে ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ প্রকাশিত হয়। এরপর প্রকাশিত হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি গৃহীত বাংলা বানানবিধি’ এবং ‘শিশু সাহিত্য সংসদ ও সাহিত্য-সংসদ প্রকাশন সংস্থার বাংলা বানানবিধি।’ এভাবে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বাংলা বানান ও বানানবিধির ইতিহাস। পৃথিবীতে যে-গুটিকয়েক আধুনিক ভাষার বানানপদ্ধতি শৃঙ্খলাযুক্ত, অন্তঃসঙ্গতিপূর্ণ ও ধ্বনি-নির্দেশিত (জামিল, ১৯৯৩ : ৯), বাংলা বানানরীতি তাদের পাশে জায়গা করে নিয়েছে। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির উৎকর্ষের কাল পর্যন্ত লেখার যে ইতিহাস, তা সত্যিই বিস্ময়কর। এ বিস্ময়কর ইতিহাস সৃষ্টিতে অবদান রয়েছে অযুত কোটি মানুষের।

গ্রন্থপঞ্জি
অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৯৫)। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত। প্রথম খ-। কলকাতা
আনিসুজ্জামান (১৯৮৪) সম্পাদিত। মুনীর চৌধুরী রচনাবলী। ৩য় খ-। বাংলা একাডেমী। ঢাকা
জামিল চৌধুরী (১৯৯৩)। বানান ও উচ্চারণ। বাংলা একাডেমী। ঢাকা
জামিল চৌধুরী (১৯৯৪) সংকলিত। বাংলা একাডেমী বাংলা বানান অভিধান। ঢাকা
পবিত্র সরকার (২০০৪)। বাংলা বানান সংস্কার : সমস্যা ও সম্ভাবনা। কলকাতা
পি. আচার্য (১৯৯৭)। বাংলা বানান বিচিন্তা। প্রথম খ-। কলকাতা
মনসুর মুসা (১৯৯৪) সম্পাদিত। বাঙলাদেশ। আগামী প্রকাশনী। ঢাকা
মির্জা হারুণ-অর-রশিদ (২০১১)। চলিত ভাষা বানানে বাণানে রেষারেষি। ঢাকা
মুহম্মদ আবদুল হাই (১৯৯৩)। ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব। পঞ্চম মুদ্রণ। ঢাকা
মোহাম্মদ আব্দুল কাইউম (২০০০)। পা-ুলিপি পাঠ ও পাঠ-সমালোচনা। ঢাকা
শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী ও অন্যান্য (১৯৮৮) সম্পাদিত। বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ। বাংলা একাডেমী। ঢাকা
শৈলেন্দ্র বিশ্বাস (১৯৮৬) সংকলিত। সংসদ বাঙ্গালা অভিধান। কলিকাতা
সুকুমার সেন (১৯৯৬)। ভাষার ইতিবৃত্ত। পঞ্চম মুদ্রণ। কলকাতা
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (২০০৮)। ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ। কলকাতা
হায়াৎ মামুদ (২০১১)। উচ্চতর স্বনির্ভর বিশুদ্ধ ভাষা-শিক্ষা। ঢাকা