By Dr. Abdul Alim on February, 14 2018 with no comments

মজার কিছু শব্দ

বানান আয়ত্ত করার নানা কৌশল আছে। শব্দের ব্যুৎপত্তি ও গঠনশৈলী সম্পর্কে ধারণা থাকলে অসংখ্য বানান শুদ্ধ করে লেখা যায়। সংশ্লি¬ষ্ট শব্দটি কীভাবে গঠিত হয়েছে কিংবা ভাষায় এসেছে, সে-সম্পর্কে ধারণা থাকলে শব্দটি মনের মধ্যে গেঁথে যায়। ছবির মতো ভাসতে থাকে চোখের সামনে। মজার মজার শব্দ আছে বাংলা ভাষায়। সেগুলোর উৎস, গঠন এবং অর্থগত দিক জানা থাকলে লেখার সময় বা কথা বলার সময় শুদ্ধভাবে উচ্চারিত হয় এবং কলমের মাথায় আসে। এ জাতীয় কিছু শব্দের পরিচয় :

অগ্নিপরীক্ষা
অগ্নিপরীক্ষা’ শব্দের অর্থ―অতি কঠিন পরীক্ষা। আগুনের সাহায্যে শুদ্ধাশুদ্ধ নির্ণয় বা বিচার। (এনামুল, ২০০৮ : ১) কোনো কোনো রতœপাথর আগুনে পুড়িয়ে আসল-নকল যাচাই করার পরীক্ষা অগ্নিপরীক্ষা নামে পরিচিত। তবে বাংলা ভাষায় এ-শব্দটি অন্য অর্থে ব্যবহৃত হয়। মানুষ কোনো কঠিন বিপদে পড়লে সে-পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মুহূর্তকে অগ্নিপরীক্ষা বলা হয়। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ শব্দটি ব্যবহারের নেপথ্যে আছে পৌরাণিক গল্প। রামচন্দ্রের স্ত্রী সীতা অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছিলেন, রাক্ষসরাজ রাবণ তাঁকে অপহরণ করে রাক্ষসপুরীতে বন্দি করে রেখেছিলেন। মুক্তি পাওয়ার পর প্রজারা সীতার চরিত্র সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেন। তারপর অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে সীতাকে প্রমাণ করতে হয় তাঁর চরিত্রের সততা। এরপর থেকে কঠিন বিপদ পাড়ি দেওয়া প্রসঙ্গে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

অলক্ষ্মী
দুর্ভাগা নারী অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এ-শব্দটির পেছনেও রয়েছে পৌরাণিক কাহিনী। ভারতীয় পুরাণে অলক্ষ্মী দুর্ভাগ্যের দেবী। (সুধীরচন্দ্র, ১৪০৪ : ৩২) ভাগ্যদেবী লক্ষ্মীর বড়ো বোন। সমুদ্রমন্থন কালে তিনি লক্ষ্মীর সঙ্গে আবির্ভূত হন। তাঁর মূর্তি কৃষ্ণবর্ণের। পরনের কাপড়ও কালো রঙের। হাতে ঝাঁটা, বাহন গর্দভ। সবসময় ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করা তাঁর কাজ। সমুদ্র থেকে লক্ষ্মীর সাথে উঠে এলেও দেবতারা কেউ তাঁকে গ্রহণ করেন নি। পরে তাঁর বিয়ে হয় দুঃসহ নামের এক মহাতপা মুনির সঙ্গে। দুঃসহ নিজে অন্যদের জ্বালাতন করলেও অলক্ষ্মীর জ্বালা-তাপ সহ্য করতে না পেরে তাঁকে পরিত্যাগ করে চলে যান। এরপর অলক্ষ্মী দেবতাদের কাছে জানতে চান পৃথিবীতে তাঁর জায়গা হবে কোথায়। অবশেষে তাঁর জায়গা হয় যেখানে সর্বদা কলহ-বিবাদ আছে সেখানে। যে-ব্যক্তি সর্বদা মিথ্যা কথা বলে, যে-কদাচারী তার কাছে জায়গা হয় অলক্ষ্মীর। পৌরাণিক এই কাহিনী থেকে ‘অলক্ষ্মী’ শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে এবং বর্তমানে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে। দুর্ভাগা, দরিদ্র অবস্থা ইত্যাদি বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে কপিলা সম্পর্কে তার মা কুবেরের কাছে বলেছে―‘এই পোড়াকপাইল্যার কথা কই, কই আমাগো কপিলার কথা। অলক্ষ্মীর মরণ নাই।’

অহিনকুল
অহিনকুল শব্দের অর্থ―‘সহজাত শত্রুতা; সাপ ও বেজির মধ্যে বিদ্যমান বৈরীভাবের ন্যায় সম্বন্ধ।’ (এনামুল, ২০০৮ : ৭৬) একজনের সাথে আরেকজনের শত্রুতার সম্পর্ক বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। অহি অর্থ সাপ আর নকুল শব্দের অর্থ বেজি। বনে-জঙ্গলে সাপ ও বেজির মধ্যে সর্বদা লড়াই চলে। একে অপরকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এই শত্রুতার সম্পর্ক বন থেকে চলে এসেছে সমাজের মানুষের মধ্যে। মানুষের মধ্যে বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের উদাহরণ হিসেবে ‘অহিনকুল’ শব্দটি প্রচলিত আছে। এটি একটি প্রাণিবাচক শব্দ। অহি ও নকুল―এই দুই শব্দের দ্বন্দ্ব সমাসে তৈরি হয়েছে ‘অহিনকুল’। ভাষা জগতের দ্বন্দ্ব সমাসে অহি ও নকুল একত্রে বাস করলেও বাস্তব জগতে এদের ভয়ানক দ্বন্দ্ব এবং এদের সম্পর্ক ও অবস্থান ভিন্ন। এটাই অহিনকুল সম্পর্কের গূঢ় কথা। (ফরহাদ, ২০০৭ : ৮)

আঁতাত
‘পরস্পর বন্ধুত্ব বা সদ্ভাব’ বুঝাতে আঁতাত শব্দটি প্রচলিত আছে। এর অর্থ গোপন কাজে সহাযোগিতার সম্পর্ক। এক রাষ্ট্রের সাথে আরেক রাষ্ট্রের সদ্ভাব ও সহযোগিতার সম্পর্ককেও আঁতাত বলা হয়। শব্দটি এসেছে ফরাশি ভাষা থেকে। ‘ফরাশি বহঃবহঃব শব্দের প্রতিবর্ণীকৃত রূপ। ফরাশি উচ্চারণ আঁতাঁৎ।’ (সুভাষ, ২০১১ : ৫০) আঁতাত কথাটি শুনলে অনেক সময় মনে ভয়ের উদ্রেক হয়। পরস্পরবিরোধী তিনটি পক্ষের মধ্যে দুটি পক্ষের আঁতাত হলে অন্য পক্ষ ভয় পায়। তবে সবসময় আঁতাত ভয়ের কারণ নাও হতে পারে। দু পক্ষের আঁতাত কখনও কখনও শুভ কাজের ইঙ্গিত বহন করে। ‘আঁতাত’ শব্দ ব্যবহারভেদে কখনও ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা সৃষ্টি করে। কখনও নিরাপদ ভাব, আবার কখনও আশাব্যঞ্জক ভাব নিয়ে আসে। শব্দটি বাংলাভাষায় নানা সময় ব্যবহৃত হলেও এটি কিন্তু বিদেশি শব্দ। ‘রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে সদ্ভাব ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের সূত্র ধরে সংবাদপত্রের মাধ্যমে সরাসরি বাংলাভাষায় প্রবেশ করে এবং পরে আমাদের সমাজজীবনে তা ভিন্ন ব্যঞ্জনা পায়।’ (ফরহাদ, ২০০৭ : ৮-৯)

উজবুক
আহাম্মক, বোকা, মূর্খ ও আনাড়ি অর্থে ‘উজবুক’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। মধ্যযুগে মুসলিম শাসকগণ উজবেকিস্তান থেকে ভাড়াটে সৈনিক আনতেন। ঐ সৈন্যদের বলা হতো উজবক বা উজবেক। এই উজবেক থেকেই ‘উজবুক’ শব্দটির সৃষ্টি। উজবেকিস্তানের ঐ সৈন্যরা যতটা শক্তিমান ছিলেন ততটা বুদ্ধিমান ছিলেন না। তাদের বুদ্ধিহীনতাকেই পরে নির্বোধ লোকের উপমা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ দৈহিক শক্তির অধিকারী কিন্তু বুদ্ধিহীন ও আহাম্মক লোক বোঝাতে ‘উজবুক’ শব্দটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে।

কাকতালীয়
কাকতালীয় হচ্ছে কার্যকারণহীন দুটো ঘটনা ; ‘তাল-গাছে কাক বসামাত্র তালপতনের ন্যায় কোনো ঘটনা।’ (এনামুল, ২০০৮ : ২৪০) বাস্তব অথচ আকস্মিক ঘটনার সঙ্গে লৌকিক গালগল্প মিশে শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে। তালগাছের পাকা তাল কাক উড়ে আসার পরই গাছ থেকে মাটিতে পড়লো। গাছতলার লোকেরা ভাবলো কাকই বুঝি তালটি ফেলেছে। বাস্তবে কিন্তু এমনিতেই তালটি পড়েছে। কাকের যে শক্তি তাতে বোঁটা থেকে তাল খসানো সম্ভব নয়। তাল পাকলে এমনিই পড়ে। তাই কার্যকারণ ছাড়া কোনো ঘটনা হঠাৎ করে ঘটলে তাকে কাকতালীয় বলা হয়।

কূপম-ূক
বাইরের জগৎ সম্পর্কে ধারণা কম লোককে কূপম-ূক বলা হয়। কূপম-ূকের জ্ঞান থাকে সীমাবদ্ধ। কূপ শব্দের অর্থ―কুয়ো আর ম-ূক অর্থ―ব্যাঙ। ‘কূপম-ূক’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ কুয়োর ব্যাঙ। কুয়োর ব্যাঙ কূপের সীমাবদ্ধ জলে বাস করে। কুয়োর বাইরের জগৎ সম্পর্কে তার ধারণা থাকে না। কুয়োর বাইরের নদী, সমুদ্র, পাহাড়, পর্বত এবং বিশ্বচরাচরের সকল কিছু থেকে সে বিচ্ছিন্ন। কূপের সীমাবদ্ধ পরিসরই তার বিচরণের ক্ষেত্র। ঠিক একইভাবে আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে, যারা কুয়োর ব্যাঙের মতোই সীমাবদ্ধ জ্ঞানের মধ্যে বাস করে। বিশ্বজগতের অপার রহস্য এবং মানবসংসারের ব্যাপক বিষয় সম্পর্কে তার ধারণা নেই। এ-রকম মানুষকে বলা হয় কূপম-ূক। ‘কূপম-ূক’ শব্দের অর্থ কুয়োর ব্যাঙ হলেও ব্যবহারিক অর্থে সীমিত জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে বোঝাতে ‘কূপম-ূক’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

গৌরচন্দ্রিকা
‘গৌরচন্দ্রিকা’ শব্দের অর্থ―ভূমিকা, মুখবন্ধ ও ভণিতা। এ-শব্দটির উৎপত্তির পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ ঘটনা। কেউ কেউ আছেন, যারা গৌরচন্দ্রিকা ছাড়া কথা বলতে পারেন না। পালাকীর্তন গান শুরুর পর্বে কখনও কখনও গৌরচন্দ্র অর্থাৎ মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের স্তুতিমূলক গান গাওয়া হয়। গৌরচন্দ্রের বন্দনা করে এই গান গাওয়া হয় বলে এ জাতীয় গানকে বলা হয় গৌরচন্দ্রিকা। গৌরচন্দ্রিকা আগে গেয়ে তারপর শুরু করা হয় মূল গান। এজন্য আসল কথা বলার পূর্বে কিছু বলা হলে তা গৌরচন্দ্রিকা নামে অভিহিত হয়। শব্দটি বাংলা ভাষায় ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে।

ছত্রভঙ্গ
ছত্রভঙ্গ শব্দের অর্থ―এলোমেলো, দলের বিশৃঙ্খলা, সারিভাঙা ইত্যাদি। কোনো দাবি আদায়ে সংঘবদ্ধ জনতাকে পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ছত্রভঙ্গের ‘ছত্র’ এসেছে আরবি ‘সর্ত’ থেকে। ‘সর্ত’ শব্দের অর্থ হল লাইন, পঙ্ক্তি বা সারি। আর ভঙ্গ শব্দের অর্থ হল ভাঙা। সুতরাং ‘ছত্রভঙ্গ’ শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় ভাঙা লাইন, সারি বা পঙ্ক্তি। বিশৃঙ্খল বা এলোমেলো অবস্থা বোঝাতে ‘ছত্রভঙ্গ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

জগাখিচুড়ি
সাধারণত বিশৃঙ্খল অর্থে ‘জগাখিচুড়ি’ শব্দটি প্রচলিত। নানা কিছুর অদ্ভুত বা জটিল মিশ্রণ বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। শব্দটির উৎপত্তির ইতিহাস মজাদায়ক। ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের পুরীতে অবস্থিত জগন্নাথ দেবের মন্দিরপ্রাঙ্গণে আয়োজিত খিচুড়িভোগ থেকে ‘জগাখিচুড়ি’ শব্দটির উদ্ভব ঘটেছে। ভক্তদের দেওয়া নানা রকম সবজির সংমিশ্রণে এই খিচুড়ি রান্না করা হয়। ভোজনের সময় জাতিধর্ম নির্বিশেষে দরিদ্র মানুষেরা অংশীদার হয়। জগন্নাথ মন্দিরে খিচুড়িভোগে নানা রকম ডাল-সবজির মিশ্রণ এবং পরিবেশনের সময় বিভিন্ন বর্ণের মানুষের আগমন―এসব মিলেই জগাখিচুড়ি কথাটির সৃষ্টি। বর্তমানে শব্দটির ব্যবহারের ক্ষেত্রে খিচুড়ি এবং জগন্নাথ কোনোটিই নেই। আছে কেবল বিশৃঙ্খলা ও মিশ্রণের প্রসঙ্গ। কোনো বিষয়ে বা প্রসঙ্গে পরস্পরবিরোধী ভাব কিংবা ঘটনা দেখা গেলে ‘জগাখিচুড়ি’ শব্দ দ্বারা তা বোঝানো হয়।

তিলোত্তমা
অতি সুন্দরী নারী, পরমা সুন্দরী অর্থে ‘তিলোত্তমা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এ-শব্দের উৎপত্তির সঙ্গে পৌরাণিক ঘটনার সংযোগ আছে। ভারতীয় পুরাণের স্বর্গ-সুন্দরী তিলোত্তমা তার রূপের সৌন্দর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে বাংলা ভাষায়। পুরাণে তিলোত্তমার রূপ মৃত্যুর কারণ হয়েছিল সুন্দ ও উপসুন্দ নামের দুই ভাইয়ের। ব্রহ্মার কাছে অমরত্ব পাওয়া দুই ভাই পরস্পরের হাতেই মৃত্যুবরণ করেন তিলোত্তমাকে পাওয়ার যুদ্ধে। সুন্দ ও উপসুন্দ ছিলেন দেববিদ্বেষী। তাঁদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। দেবতাদের রক্ষার জন্য ব্রহ্মা বিশ্বকর্মাকে পরমাসুন্দরী নারী সৃষ্টি করতে বলেন। জগতের সমস্ত উত্তম জিনিস তিল তিল সংগ্রহ করে বিশ্বকর্মা অপূর্ব রূপসী নারী সৃষ্টি করে নাম দিলেন তিলোত্তমা। এরপর সুন্দ-উপসুন্দকে আকৃষ্ট করার জন্য তিলোত্তমাকে তাদের কাছে পাঠানো হল। তিলোত্তমাকে দেখে দুই ভাইয়ের মাথা ঘুরে যায়। তাকে পাওয়ার জন্য তাঁরা একে অপরের সঙ্গে আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে দুজনেই নিহত হন। সুন্দরী নারীকে পরিচয় করাতে এখন বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত শব্দরূপে ‘তিলোত্তমা’ নিজের আসন পাকাপোক্ত করে নিয়েছে।

দক্ষযজ্ঞ
দক্ষযজ্ঞ শব্দের অর্থ―ল-ভ-, হইচই, ওলটপালট, হট্টগোল প্রভৃতি। এ-শব্দটির উৎসস্থল ভারতীয় পুরাণ। ব্রহ্মার পুত্র ছিলেন দক্ষ। দক্ষের কন্যা সতীর বিয়ে হয় শিবের সাথে। একবার এক ঋষির যজ্ঞে শিব তাঁর শ্বশুর দক্ষকে অভিবাদন না জানানোর কারণে দক্ষ রাগান্বিত হন। শিবকে অপমান করার জন্য দক্ষ নিজেই এক যজ্ঞের আয়োজন করেন। সেখানে শিব ব্যতীত অন্য দেবতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। দক্ষকন্যা অর্থাৎ শিবের স্ত্রী সতী বিনা আমন্ত্রণে সেই যজ্ঞে উপস্থিত হন। সতীকে দেখে দক্ষ শিবের নিন্দা করতে থাকেন। স্বামীর নিন্দায় স্থির থাকতে না পেয়ে সতী দেহত্যাগ করেন। এ সংবাদ পেয়ে শিব সেখানে গিয়ে যজ্ঞানুষ্ঠানের সবকিছু তছনছ করে দেন। এই হল দক্ষযজ্ঞের কাহিনী। বাংলা ভাষার ‘দক্ষযজ্ঞ’ শব্দটি কোনোকিছু ল-ভ- বা তছনছ করা অর্থে ব্যবহৃত হয়।

নখদর্পণ
‘নখদর্পণ’ শব্দের অর্থ নখরূপ দর্পণ বা নখই দর্পণ। কোনো বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। নখদর্পণ অর্থাৎ যে-নখ দর্পণরূপে ব্যবহার করা হয় তা-ই নখদর্পণ। এ-শব্দটির উৎপত্তির রয়েছে ভিন্ন ইতিহাস। শোনা যায়, গুনিনের কাছে কোনো ব্যক্তি কিছু জানতে গেলে গুনিন তার বৃদ্ধাঙ্গুলের নখে তেল মেখে জিজ্ঞাসু ব্যক্তিকে জ্ঞাতব্য বিষয় মন্ত্রবলে তেল মাখানো নখে প্রতিবিম্বিত করে। নখটি তখন আয়নার মতো হয়ে যায় এবং তাতে জিজ্ঞাসার সকল বিষয় দেখা যায়। নখ আয়নার মতো হোক বা না হোক, তাতে কিছু দেখা যাক বা না যাক―যাদুবিদ্যার এই নখদর্পণ বাংলা ভাষায় স্থায়ী আসন লাভ করেছে। কোনো বিষয়ে সামগ্রিক ধারণা বোঝাতে এখন ‘নখদর্পণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

বাজখাঁই
অতি কর্কশ কণ্ঠস¦র বোঝাতে ‘বাজখাঁই’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। এর উৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজা-বাদশার ইতিহাস। ষোল শতকের মাঝামাঝি সময়ে মালব প্রদেশের শাসনকর্তা ছিলেন বাজবাহাদুর খাঁ (প্রকৃত নাম মালিক বায়েজিদ)। তিনি ও তাঁর পরমা সুন্দরী গায়িকা স্ত্রীকে নিয়ে নানা গল্পকাহিনী প্রচলিত আছে। গীতবাদ্যে পারদর্শী বাজবাহাদুর খাঁ রাজকার্যে উদাসীন ছিলেন। সম্রাট আকবরের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি দু বার পরাজিত হন। তাঁর শেষজীবন কাটে আকবরের রাজদরবারে সংগীতসাধক রূপে। ঐতিহাসিক আবুল ফজল বাজবাহাদুর খাঁর সংগীত প্রতিভার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বাজবাহাদুর খাঁ এক ধরনের গায়নভঙ্গি তৈরি করেছিলেন, যা বাজখানি রীতি নামে পরিচিত। তাঁর গলা ছিল উদাত্ত গম্ভীর ও কর্কশ। তাঁর গায়নরীতির স্বরের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বাজখাঁই গলা বাক্যভঙ্গির সৃষ্টি। এখন উচ্চ, কর্কশ বা গম্ভীর কণ্ঠস্বর বোঝাতে ‘বাজখাঁই’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। ‘হৈমন্তী’ গল্পে হৈমর সঙ্গে অপুর বাবা যে কর্কশ গলায় কথা বলেছিল সে-সম্পর্কে অপু বলেছে―‘হায় রে, তাঁহার বউমার প্রতি বাবার সেই মধুমাখা পঞ্চম স্বর আজ একেবারে এমন বাঁজখাই খাদে নামিল কেমন করিয়া।’

বামপন্থী
সাধারণত সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অনুসারীদের বোঝাতে ‘বামপন্থী’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বাংলার এ-শব্দের আগমন ঘটেছে ইউরোপ থেকে। শব্দটির উৎপত্তির পেছনে রয়েছে ইউরোপের সমাজ এবং রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস। ইউরোপের প্রাচীন সামাজিক প্রথা অনুসারে গৃহকর্তা সম্মানিত অতিথিদের তার ডানপাশে বসিয়ে আপ্যায়ন করেন। এই সামাজিক প্রথা কালক্রমে ঢুকে পড়ে ইউরোপের পার্লামেন্টে। রক্ষণশীল দল তথা অভিজাত সমাজের প্রতিনিধিরা পার্লামেন্টের যেদিকে আসন নিতেন তাদের বাম দিকে বসতেন র‌্যাডিকেল দল। রক্ষণশীল অভিজাতদের বামপাশে বসার কারণে র‌্যাভিকেল বা প্রগতিশীল সদস্যদের বলা হতো ষবভঃরংঃ বা বামপন্থী। আর রক্ষণশীলদের বলা হতো ডানপন্থী। পরবর্তীতে রাজনীতির বিবর্তনে বামপন্থী অভিধা পরিবর্তিত হয়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অনুসারীদের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল। ইংরেজি ষবভঃরংঃ শব্দটি রূপান্তরিত হয়ে বাংলা রূপ পেয়েছে বামপন্থী। সমাজতান্ত্রিক বা কম্যুনিস্ট আদর্শের ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলকে ‘বামপন্থী’ বলে অভিহিত করা হয়।

মধুচন্দ্রিমা
নবদম্পতির একান্ত অবকাশকাল বোঝাতে ‘মধুচন্দ্রিমা’ শব্দটি প্রচলিত। ইংরেজি হানিমুন কথাটির বাংলা করা হয়েছে মধুচন্দ্রিমা। ইংরেজি হানি ও মুন মিলে হয়েছে হানিমুন শব্দটি। এর আদি অর্থ মধু খাওয়ার মাস। ‘বাংলা মধুচন্দ্রিমা শব্দের মধ্যে মাস ব্যাপারটি একেবারেই নেই। মধু তো নেই-ই।’ (ফরহাদ, ২০০৭ : ৯৩) প্রাচীন জার্মানির সামাজিক রীতি অনুসারে বিয়ের পর নবদম্পতিকে একমাস আলাদা স্থানে রাখা হতো। তাদের ঘটা করে খাওয়ানো হতো মধুর শরবত। পরবর্তীকালে তা ইউরোপের অন্য দেশের সমাজেও প্রচলিত হয়। সময়ের বিবর্তনে হানিমুনের মধ্যে মধু খাওয়ার বিষয়টি উঠে যায়, থেকে যায় শুধু নবদম্পতির রোমান্টিক অবকাশ যাপনের বিষয়টি। এখন মধুচন্দ্রিমা এক মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নবদম্পতির বিয়ের পর ইচ্ছামতো হানিমুন যাপন করতে পারে। বিয়ের অব্যবহিত পরেও যেতে পারে, আবার সুবিধামতো সময়েও যেতে পারে।

মান্ধাতা
‘মান্ধাতা’ শব্দের প্রচলিত অর্থ অতি প্রাচীন কাল। এ-শব্দটি এসেছে পৌরাণিক ইতিহাস থেকে। ভারতীয় পুরাণের এক বিখ্যাত রাজার নাম মান্ধাতা। তিনি সূর্য বংশের রাজা যুবনাশ্বের পুত্র। (সুধীরচন্দ্র, ১৪০৪ : ৪২৯) মান্ধাতা দিগি¦জয়ে বের হয়ে প্রায় সমগ্র পৃথিবী জয় করেছিলেন। রাক্ষসরাজ রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে সমান বলবীর্য প্রদর্শন করার তাঁরা বন্ধুত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি বিন্দুমতীকে বিয়ে করেন। মধুর পুত্র লবণের হাতে তাঁর মৃত্যু হয়। ভারতীয় পুরাণের এই মান্ধাতা রাজার নাম আধুনিক বাংলায় যুক্ত হয়েছে পুরানো ধারণা, বিশ্বাস বা কোনো বিষয়কে নির্দেশ করতে। কথায় কথায় আমরা বলি, ওটা মান্ধাতার আমলের জিনিস।

শ্বেতহস্তী
‘শ্বেতহস্তী’ বলতে নির্দেশ করে, যার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। অর্থাৎ যাকে পুষতে সর্বস্বান্ত হতে হয়। এর আক্ষরিক অর্থ সাদা হাতি। ‘শ্বেতহস্তী’ শব্দটির উৎপত্তির ক্ষেত্রে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। থাইল্যান্ডের পূর্বনাম ছিল শ্যামদেশ। শ্যামদেশকে বলা হতো শ্বেতহস্তীর দেশ। সেখানকার সকল শ্বেতহস্তীর মালিক ছিলেন রাজা। জনগণের অর্থে সেসব হাতি প্রতিপালিত হতো। শ্বেতহস্তী ছিল পবিত্রতার প্রতীক এবং রাজার ক্ষমতার স্মারক। এগুলোকে প্রতিহত করার সাহস ও অধিকার কারও ছিল না। শ্বেতহস্তী দ্বারা কোনো কাজ করানো হতো না। রাজা কোনো মন্ত্রী বা অমাত্যের প্রতি নাখোশ হলে তাকে কিছু না বলে শ্বেতহস্তী উপহার দিতেন। শ্বেতহস্তী প্রতিপালন করতে গিয়ে উপহার প্রাপক সর্বস্বান্ত হতেন। এখান থেকে ভাব ধার করে ইংরেজরা যিরষব বষবঢ়যধহঃ শব্দটি তৈরি করেন। পরে সেটি ‘শ্বেতহস্তী’ নামে বাংলার প্রবেশ করে। বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরকারের অযথা অর্থব্যয় করাকে শ্বেতহস্তী পোষার সাথে তুলনা করা হয়।

¯œাতক
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ডিগ্রিকে বলা হয় ¯œøাতক। ইংরেজিতে বলে গ্র্যাজুয়েট। ¯œাতক শব্দটি ব্যাচেলর্স ডিগ্রির বাংলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ-শব্দের উৎসগত ইতিহাস কৌতূহলজনক। প্রাচীন ভারতবর্ষে যারা গুরুগৃহ থেকে বিদ্যার্জন শেষ করে গার্হস্থ্য জীবনে প্রবেশ করতো তাদের বলা হতো ¯œাতক। বিদ্যালাভের সমাপ্তিসূচক আনুষ্ঠানিক ¯œান থেকেই ¯œাতক শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। ইংরেজি ব্যাচেলর্স ডিগ্রির ব্যাচেলর শব্দটির ব্যুৎপত্তিও মজার। ব্যাচেলর শব্দটির তৈরি হয়েছে ল্যাটিন শব্দ ইধপপধষধৎিবংবং থেকে যার অর্থ গোরুর যতœ করে যে, অর্থাৎ―রাখাল। ¯œাতক থেকে তৈরি হয়েছে ¯œাতকোত্তর শব্দ। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি অর্থে ¯œাতকোত্তর শব্দ ব্যবহার করা হয়।

হুলিয়া
‘হুলিয়া’ বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত শব্দ। রাজপথে প্রায়ই শোনা যায় : ‘জেল-জুলুম হুলিয়া/নিতে হবে তুলিয়া।’ শব্দটির অর্থ―আসামিকে গ্রেফতারের জন্য তার চেহারার বিবরণসহ বিজ্ঞাপন। এটি আইন-আদালতের শব্দ। আদালতের নির্দেশে আসামির বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। হুলিয়া জারি আর ওয়ারেন্ট কিংবা গ্রেফতারি পরোয়ানা কিন্তু এক নয়। ওয়ারেন্ট হলো আসামিকে থানার মাধ্যমে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করার নির্দেশ। অন্যদিকে হুলিয়া হল পলাতক আসামির বিস্তারিত বিবরণসহ গ্রেফতারি পরোয়ানা। ‘হুলিয়া’ শব্দটি ফারসির মাধ্যমে বাংলায় এসেছে। এটি মূলত আরবি শব্দ। আরবি হুলিয়া শব্দের অর্থ বাহ্যিক বা শারীরিক বিবরণ―এ বিবরণ মানুষের চেহারার বিবরণ। ইসলাম ধর্মে মানুষের ছবি আঁকা নিষেধ ছিল বলে এক সময় নিখুঁতভাবে তার হুলিয়া লেখা হতো। হুলিয়া পড়লেই সংশ্লি¬ষ্ট মানুষটিকে চেনা যেতো। বাংলায় হুলিয়া শব্দের অর্থ কিছুটা ঠিক থাকলেও ব্যবহার একেবারে বদলে গেছে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
মুহম্মদ এনামুল হক (২০০৮) সম্পাদিত। বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান। ঢাকা
সুধীরচন্দ্র সরকার (১৪০৪) সংকলিত। পৌরাণিক অভিধান। ষষ্ঠ সংস্করণ। কলকাতা
ফরহাদ খান (২০০৭)। বাংলা শব্দের উৎস অভিধান। পুনর্মুদ্রণ। ঢাকা
সুভাষ ভট্টাচার্য (২০১১)। বাংলা প্রয়োগ অভিধান। তৃতীয় মুদ্রণ। কলকাতা